‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলায় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে কোথাও বর্ণাঢ্য র্যালি, কোথাও পদযাত্রা, আবার কোথাও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভাগুলোতে বক্তারা বলেন, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো শিক্ষা ও সাক্ষরতা। একজন মানুষকে শুধু পড়তে ও লিখতে শেখানোই নয়, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ করতে সক্ষম করে তোলা, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাও সাক্ষরতার বিস্তৃত উদ্দেশ্যের অংশ।
বক্তারা আরও বলেন, দেশে সাক্ষরতার হার ধীরে ধীরে বাড়লেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোর, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষাবঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার আওতায় আনতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
খুলনায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত
খুলনায় ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এর আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়।
শোভাযাত্রাটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়। এতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিছুজ্জামান ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান।
আলোচনা সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একজন মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে এবং সেই অধিকার আদায়ে সক্ষম হতে হলেও শিক্ষার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিক্ষা মানুষকে শুধু জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেয় না, বরং সমাজে তার অবস্থান শক্তিশালী করে এবং নিজের ও পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য মিড ডে মিল, উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান।
সুনামগঞ্জে র্যালি ও আলোচনা সভা
‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্যে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসন, সুনামগঞ্জ ও জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আয়োজনে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাকিলা রহমানের সভাপতিত্বে এবং পিটিআই ইন্সপেক্টর মোরশেদুল হকের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান রাসেল, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস, লেট আল লার্ন প্রকল্প পরিচালক হিমাদ্র প্রসাদ মিস্ত্রী, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি পঙ্কজ কান্তি দে, শিক্ষক হারুনুর রশীদ ও নাসরিন বেগম চৌধুরীসহ অনেকে।
সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষা ও সাক্ষরতার মাধ্যমে একটি জাতি এগিয়ে যায়। শিক্ষার সুযোগ যত বিস্তৃত হবে, সমাজের মানুষ তত বেশি সচেতন ও দক্ষ হয়ে উঠবে। দারিদ্র্যতা কমাতেও শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তারা বলেন, দেশে নিরক্ষরতা দূর করার পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে সাক্ষরতা নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার পাশাপাশি যারা নানা কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে, তাদের আবার শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নাটোরে সাক্ষরতার হার ৭৪ শতাংশ
নাটোরে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৪ শতাংশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে নাটোরসহ সারাদেশে সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, এসডিজির অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো নাটোর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রনি আহম্মেদ বলেন, ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নাটোরে সাক্ষরতার হার ছিল ৭১ শতাংশ। ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী এ হার বেড়ে ৭৪ শতাংশ হয়েছে।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে জেলায় সাক্ষরতার হার বেড়েছে। তবে শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
সহকারী পরিচালক বলেন, শুধু পড়তে ও লিখতে পারার সক্ষমতাই সাক্ষরতা নয়। লিখতে, পড়তে ও হিসাব করতে পারার পাশাপাশি ব্যক্তির পেশা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকার সক্ষমতাকেও সাক্ষরতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শতভাগ সাক্ষরতার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নাটোরে ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্ম দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’ চলমান রয়েছে। ছয় মাস মেয়াদি এ কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণার্থীদের সাক্ষরতা জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদার আলোকে বিভিন্ন পেশাগত দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে শিক্ষার পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীরা জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে একদিকে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
সভায় জানানো হয়, আগামী বছরের শুরুতে নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘অল্টারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটি’ নামে একটি বৃহৎ সাক্ষরতা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জান্নাতআরা ফেরদৌস, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রোস্তম আলী হেলালী, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নোয়াখালীতে সাক্ষরতার হার ৭৫.৫২ শতাংশ
‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আয়োজনে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।
পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জিনাত রেহানার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবুল কাশেম ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসরাত নাসিমা হাবীব।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, এনজিও প্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা জানান, নোয়াখালীতে সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ হার আরও বাড়ানোর জন্য সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে শুধু প্রচলিত বর্ণমালা চেনা বা নাম লিখতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, তৃণমূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষাবঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে কার্যকর সাক্ষরতার আওতায় আনতে হবে।
তাদের প্রায়োগিক সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতা ছাড়া শুধু প্রাথমিক পড়াশোনা জানা একজন মানুষের জীবন ও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে সাক্ষরতার বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। একটি জনগোষ্ঠী যত বেশি শিক্ষিত ও দক্ষ হবে, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তত বাড়বে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মানুষের ধারণাও বাড়বে।
লালমোহনে পদযাত্রা ও আলোচনা সভা
ভোলার লালমোহনে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে পদযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর যৌথ আয়োজনে এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সিফাত বিন সাদেক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ।
দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত পদযাত্রায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পদযাত্রাটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পরে আলোচনা সভায় মিলিত হয়।
আলোচনা সভায় দিবসটির প্রতিপাদ্য ও সাক্ষরতার গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য দেন লালমোহন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও যুগান্তর প্রতিনিধি জসিম জনি, লালমোহন মডেল একাডেমির প্রধান শিক্ষক ও আমার দেশ প্রতিনিধি আজিম উদ্দিন খান, আব্দুল ওহাব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মো. আরিফুর রহমান, জাসাস সভাপতি ও শিল্পকলা একাডেমির সম্পাদক আজাদুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, বিজেপির সেক্রেটারি আব্দুর রব সোহাগ, লালমোহন প্রেসক্লাবের সভাপতি সোহেল আজিজ শাহিন এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জাফর ইকবালসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, শিক্ষিত মানুষরা উদ্যোগ নিলে সমাজ থেকে নিরক্ষরতার অভিশাপ দূর করা সম্ভব। এজন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তারা বলেন, এখনো অনেক মানুষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণে অনেক শিশু-কিশোর বিদ্যালয়ে যেতে পারে না বা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। আবার অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি।
এ ধরনের মানুষকে শিক্ষার আওতায় আনতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা। পাশাপাশি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করার আহ্বান জানান তারা।
সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
দেশের বিভিন্ন জেলার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের কর্মসূচিতে বক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ।
সাক্ষরতা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। মানুষ পড়তে ও লিখতে পারলে শুধু নিজের জীবন পরিচালনায় সক্ষম হয় না, বরং নিজের অধিকার, দায়িত্ব ও সুযোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়। শিক্ষা মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সময়ে সাক্ষরতার ধারণা আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। শুধু পড়তে ও লিখতে পারাকে এখন আর যথেষ্ট মনে করা হয় না। দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারা, হিসাব-নিকাশ করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়াও কার্যকর সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ কারণে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তাদের বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন দক্ষতা শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নাটোরে চলমান কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্ম দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কিংবা নোয়াখালীতে প্রযুক্তিগত ও প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সেই পরিবর্তিত ধারণারই প্রতিফলন।
শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। বিভিন্ন জেলার তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, সাক্ষরতার হার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
নাটোরে ২০২২ সালের ৭১ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে সাক্ষরতার হার ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নোয়াখালীতে এ হার ৭৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে দেশের সব মানুষের কাছে কার্যকর শিক্ষা ও সাক্ষরতা পৌঁছে দিতে আরও পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া রোধ, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা—এসব পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাক্ষরতার হার বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার মান নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ শুধু পরিসংখ্যানগতভাবে সাক্ষরতার হার বাড়ানো নয়, মানুষের বাস্তব জীবনে শিক্ষার ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
একজন মানুষ যাতে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন, প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারেন, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন এবং নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন—সেই লক্ষ্যেই সাক্ষরতা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, নিরক্ষরতামুক্ত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।




