BRS TIMES
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব
অন্যান্য সংবাদজাতীয়প্রচ্ছদশিরোনাম

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব, মিয়ানমারকে ঘিরে নতুন আহ্বান

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব

প্রথমত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা এবং প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার আস্থা তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান।

পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালের সহিংসতার পর এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ দেশটি থেকে পালিয়ে আসছে।

দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ মানবিকতার কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

বাড়ছে বাংলাদেশের ওপর চাপ

দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এমনকি অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে।

কমছে মানবিক সহায়তা

রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (JRP) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

তিনি বলেন, মানবিক সহায়তার ঘাটতির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মানবিক সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। অনির্দিষ্টকালের জন্য শুধু বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গাদের দায়িত্বও চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

‘রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সহমর্মিতা প্রকাশ নয়, এখন সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং নিজেদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যেতে পারে—বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।

অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, গাম্বিয়ার উপরাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ বি. এস. জ্যালো, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

Related posts

নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়াল

News Desk

ব্যারিস্টার আরমানকে বন্দি রাখার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন সাবেক আইজিপি

News Desk

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও ৪৯ জন নিহত

News Desk

পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

News Desk

বাড্ডায় ভবন থেকে পড়ে মিস্ত্রির মৃত্যু

News Desk

বাবা-মায়ের নামসহ চাঁদাবাজদের তালিকা ঝুলানো হবে: সারজিস

News Desk
Translate »