জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। এখন সরকারের লক্ষ্য প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগকেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় আস্থা ও নিশ্চয়তা দেবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। একইভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে।
এ ছাড়া ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সেবা এক প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে। তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষা সংস্কারে গুরুত্ব
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। এ জন্য আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।
শিশুদের চরিত্র গঠনে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান
দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকার ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপ খাতেও সহায়তা দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণেরা যেন বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করতে পারে এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করা যায়, সে লক্ষ্যেও কাজ করছে সরকার।
কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা
কৃষিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি।
পানি নিরাপত্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও জানান তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টি বাংলাদেশে রয়েছে।
পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য কমানো, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আইনের শাসন
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করা হচ্ছে।
মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণ সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্যও আরও সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি।
এবারের ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা সম্মেলনে ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা, বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানব নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।




