BRS TIMES
উত্তম কুমার - তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় তাঁর জাদু
প্রচ্ছদবিনোদন

উত্তম কুমার – তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় তাঁর জাদু

উত্তম কুমারকে নিয়ে কথা উঠলেই প্রথমে যে শব্দটি আসে, সেটি ‘মহানায়ক’। কিন্তু এই একটি শব্দের মধ্যে কি সত্যিই তাঁকে ধরা যায়?

সম্ভবত যায় না।

কারণ উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর তারকাখ্যাতিতে নয়, তাঁর তৈরি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে। তিনি এমন কিছু মানুষকে বাংলা সিনেমায় রেখে গেছেন, যাঁদের বয়স বাড়েনি। সিনেমার পর্দা বদলেছে, দর্শক বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে , কিন্তু সেই চরিত্রগুলোর অনুভূতি আজও একই রকম পরিচিত।

এই জায়গাতেই অন্য অনেক জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে উত্তম কুমারের পার্থক্য। তিনি শুধু নায়ক হয়ে দর্শকের সামনে দাঁড়াননি। কখনো প্রেমিক, কখনো দ্বিধাগ্রস্ত তারকা, কখনো কবিয়াল, কখনো গোয়েন্দা, আবার কখনো সাধারণ এক বাঙালি মানুষ হয়ে পর্দায় এসেছেন। আর প্রতিবারই মনে হয়েছে , এ যেন নতুন একজন মানুষ।

উত্তম কুমারের আসল শক্তি ছিল চরিত্র বদলে ফেলা

উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার শুরুটা হয়েছিল মূলত রোমান্টিক নায়ক হিসেবে। কিন্তু তিনি খুব তাড়াতাড়িই বুঝেছিলেন, শুধু একটি নির্দিষ্ট ইমেজের ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায় না।

তাই নিজের জনপ্রিয়তাকেই তিনি বারবার চ্যালেঞ্জ করেছেন।

‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এর সুপ্রিয় কে দেখলে যেমন তাঁর সহজাত হাস্যরসের দিকটি সামনে আসে, তেমনই ‘হারানো সুর’ এর আলোক চরিত্রে তিনি হয়ে ওঠেন অনেক বেশি আবেগপ্রবণ ও কোমল।

সাড়ে চুয়াত্তর

আবার ‘সপ্তপদী’-র কৃষ্ণেন্দু একেবারেই অন্য মানুষ। প্রেমের সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক দ্বন্দ্ব যখন চরিত্রটির সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন উত্তম কুমারের অভিনয়ও হয়ে ওঠে সংযত। বড় কোনো সংলাপ নয়, অনেক সময় তাঁর চোখের দৃষ্টিই চরিত্রের মনের কথা বলে দেয়।

সপ্তপদী’-র কৃষ্ণেন্দু

এটাই উত্তম কুমারের অভিনয়ের সৌন্দর্য , তিনি চরিত্রকে বড় করে তুলতেন, নিজেকে নয়।

‘নায়ক’-এর অরিন্দম: তারকার আড়ালে যে মানুষটি

উত্তম কুমারের অভিনয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অরিন্দম মুখার্জি একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা। মানুষের চোখে তাঁর সাফল্য প্রায় নিখুঁত। কিন্তু ট্রেনযাত্রার এক পর্যায়ে ধীরে ধীরে খুলে যায় সেই মানুষটির অন্য দরজা।

সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’

সেখানে পাওয়া যায় ভয়, অপরাধবোধ, অনুশোচনা আর নিজের জীবন নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি। এই চরিত্রে উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় অভিনয় সম্ভবত তাঁর সংযম।

তিনি অরিন্দমকে বোঝাতে গিয়ে অতিরিক্ত আবেগ দেখাননি। বরং অনেক মুহূর্তে চুপ থেকেছেন। একটি প্রশ্ন শুনে মুখের সামান্য পরিবর্তন, কিছুক্ষণ নীরব থাকা কিংবা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা , এই ছোট ছোট মুহূর্তেই চরিত্রটির ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ পেয়েছে।

‘নায়ক’ তাই শুধু উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার উদাহরণ নয়। এটি তাঁর অভিনয়ক্ষমতারও বড় প্রমাণ।

‘সপ্তপদী’: প্রেমের গল্পের ভেতরের দ্বন্দ্ব

উত্তম-সুচিত্রা জুটির কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমে আসে প্রেমের দৃশ্য, গান আর রোমান্টিক মুহূর্ত। কিন্তু ‘সপ্তপদী’ একটু অন্য জায়গায় দাঁড়িয়ে।

কৃষ্ণেন্দু ও রীনার সম্পর্ক শুধু ভালোবাসার গল্প নয়। সেখানে আছে বিশ্বাস, ধর্ম, সামাজিক বাস্তবতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সংঘাত।

সপ্তপদী

উত্তম কুমার এখানে যে ধরনের অভিনয় করেছেন, তা তাঁর রোমান্টিক ইমেজের বাইরে গিয়ে তাঁকে একজন পরিণত অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

বিশেষ করে রীনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েনের দৃশ্যগুলোতে বোঝা যায়, উত্তম কুমার সংলাপের পাশাপাশি নীরবতাকেও অভিনয়ের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে জানতেন।

‘হারানো সুর’ এ প্রেমের অন্য রং

‘হারানো সুর’ উত্তম কুমারের অভিনয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আলোকের জীবনে স্মৃতি হারানোর ঘটনা গল্পের মূল অংশ হলেও ছবিটির আবেগ তৈরি হয়েছে চরিত্রটির সম্পর্ক ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে।

হারানো সুর’

এখানে উত্তম কুমারকে দেখা যায় অনেক বেশি কোমলভাবে। তাঁর অভিনয়ে চড়া আবেগের বদলে রয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিকতা। দর্শককে কাঁদানোর জন্য তিনি কান্নার ওপর নির্ভর করেননি; বরং পরিস্থিতিটাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যাতে দর্শক নিজেরাই চরিত্রটির কষ্ট অনুভব করেন।

এই জায়গাটিই তাঁর অভিনয়কে আলাদা করে।

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’: নিজের ইমেজের বাইরে এক উত্তম

উত্তম কুমারের বৈচিত্র্য বোঝার জন্য ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ অন্যতম সেরা উদাহরণ। একজন কবিয়ালের চরিত্রে অভিনয় করা শুধু সংলাপ বলার বিষয় ছিল না। চরিত্রটির ভাষা, পরিবেশ, গান এবং সামাজিক অবস্থান , সবকিছুকে নিজের মধ্যে নিতে হয়েছিল তাঁকে।

অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি

এখানে সেই চেনা শহুরে রোমান্টিক নায়ককে খুঁজে পাওয়া কঠিন। উত্তম কুমার চরিত্রটির মধ্যে এতটাই ঢুকে গিয়েছিলেন যে, অনেক দর্শকের কাছে অ্যান্টনি আলাদা একজন মানুষ বলেই মনে হয়।

একজন বড় তারকার জন্য নিজের পরিচিত চেহারা ও ভঙ্গি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্র হয়ে ওঠা সহজ নয়। উত্তম কুমার সেটিই বারবার করে দেখিয়েছেন।

‘চিড়িয়াখানা’র ব্যোমকেশ: অন্যরকম এক মহানায়ক

‘চিড়িয়াখানা’ তে ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রে উত্তম কুমারকে দেখলেও তাঁকে তাঁর প্রচলিত নায়কসুলভ ভঙ্গিতে পাওয়া যায় না।এখানে তিনি অনেক বেশি সংযত। পর্যবেক্ষণ করছেন, প্রশ্ন করছেন, মানুষের আচরণ বুঝতে চাইছেন। রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে তাঁর অভিনয়ের বড় অংশই দাঁড়িয়ে আছে চোখ ও শরীরী ভাষার ওপর।

চিড়িয়াখানা’র ব্যোমকেশ

এই চরিত্রটি আবারও প্রমাণ করে , উত্তম কুমারকে একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় আটকে রাখা যায় না।

উত্তম-সুচিত্রা: শুধু রোমান্স নয়, অভিনয়ের রসায়ন

উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটিকে শুধু বাংলা সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় রোমান্টিক জুটি বললে বিষয়টি কিছুটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তাঁদের পর্দার রসায়নের আসল শক্তি ছিল পারস্পরিক অভিনয়। একজনের সংলাপের প্রতিক্রিয়া অন্যজনের মুখে কীভাবে ফুটে উঠছে, সেটিও হয়ে উঠত দৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘চাওয়া পাওয়া’ কিংবা ‘সপ্তপদী’ , প্রতিটি ছবিতে তাঁদের সম্পর্কের ধরন আলাদা। কোথাও প্রেম সরল, কোথাও জটিল, কোথাও অভিমানী।

তবু তাঁদের একসঙ্গে দেখলে একটা বিষয় বারবার মনে হয়—তাঁরা শুধু সংলাপ বলছেন না, পরস্পরের অভিনয়কে এগিয়ে দিচ্ছেন।

তাঁর অভিনয় এত স্বাভাবিক কেন মনে হয়?

উত্তম কুমারের অভিনয় দেখলে আজও অনেক সময় মনে হয়, তিনি অভিনয় করছেন না। এর কারণ সম্ভবত তাঁর অতিরিক্ত কিছু না করার ক্ষমতা।

একজন অভিনেতা চাইলে একটি আবেগকে অনেক বেশি প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু উত্তম কুমার অনেক সময় তার উল্টো পথে হেঁটেছেন।

কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু চিৎকার করেননি।
ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু সবসময় বড় সংলাপ বলেননি।
রাগ করেছেন, কিন্তু অকারণে উত্তেজিত হননি।

এই সংযমই তাঁর অভিনয়কে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। তাঁর একটি তাকানো অনেক সময় একটি দীর্ঘ সংলাপের কাজ করেছে। একটি হাসি বদলে দিয়েছে পুরো দৃশ্যের আবহ।

তাঁর সৃষ্টি আজও পুরোনো লাগে না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উত্তম কুমারের সিনেমার মানুষের কাছে ফিরতে হয়। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম আজকের তারকার কাছেও পরিচিত। সাফল্যের চাপ, জনপ্রিয়তার বোঝা, নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে জনসম্মুখের ইমেজের দ্বন্দ্ব , এসব আজও আছে।

‘সপ্তপদী’র সম্পর্কের দ্বন্দ্বও আজকের দর্শকের কাছে অপরিচিত নয়। ‘হারানো সুর’ এর ভালোবাসা কিংবা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এর হাস্যরসও সময়ের সঙ্গে অচল হয়ে যায়নি।

কারণ সিনেমার সময় বদলালেও মানুষের আবেগ খুব বেশি বদলায় না। সেই কারণেই উত্তম কুমারের সৃষ্ট চরিত্রগুলো এখনও আমাদের সঙ্গে কথা বলে।

মহানায়কের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো তাঁর কোনো একটি ছবি নয়। বরং তিনি রেখে গেছেন চরিত্রের একটি বিশাল ভাণ্ডার।

একজন অভিনেতা কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, সেটি সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্র যদি নতুন প্রজন্মের কাছেও অর্থপূর্ণ থাকে, তখন সেই শিল্পীর গুরুত্ব অন্য মাত্রা পায়। উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। তাঁকে নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। তাঁর ছবি এখনও দেখা হয়। তাঁর অভিনয়ের দৃশ্য এখনও নতুন করে আবিষ্কার করা হয়।

তাঁর জন্মশতবর্ষে তাই শুধু মহানায়ককে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়। বরং তাঁর সিনেমাগুলো আবার দেখা দরকার। দেখতে হবে সেই অরিন্দমকে, কৃষ্ণেন্দুকে, আলোককে, অ্যান্টনিকে, ব্যোমকেশকে , যাঁরা প্রত্যেকে আলাদা, অথচ প্রত্যেকের মধ্যেই কোথাও না কোথাও উত্তম কুমারের শিল্পীসত্তার ছাপ রয়েছে।

উত্তম কুমার আজ নেই। তাঁর সময়ও নেই। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো এখনও বেঁচে আছে। আর একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় অমরত্ব আর কী হতে পারে?

মহানায়ককে সময় কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকে পারেনি।

Related posts

১০ জেলায় ৬০ কি.মি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস

News Desk

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির দাবি প্রধান উপদেষ্টার

News Desk

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত ২৬

brs@admin

ফ্যাসিস্টের দোসররা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে: আমীর খসরু

brs@admin

খামেনির শেষ বিদায়ে যোগ দিলে সহায়তা বন্ধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

News Desk

লালমনিরহাটে দুই ট্রেনের সংঘর্ষ

News Desk
Translate »