31.9 C
Bangladesh
Monday, August 31, 2026
BRS TIMES
ঋতুপর্ণ ঘোষ - যে নির্মাতা বদলে দিয়েছিলেন সিনেমার ভাষা
প্রচ্ছদবিনোদন

ঋতুপর্ণ ঘোষ – যে নির্মাতা বদলে দিয়েছিলেন সিনেমার ভাষা

কিছু পরিচালক সিনেমা বানান, আর কিছু পরিচালক সিনেমার ভাষাটাই বদলে দেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন দ্বিতীয় ধরনের নির্মাতা।

বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন এমন এক সময়ে, যখন মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে মানুষের সম্পর্ক, টানাপোড়েন, নারীর অন্তর্জগৎ এবং সমাজের নানা অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরা সহজ ছিল না। কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই গল্পগুলোই বলেছিলেন নিজের মতো করে।

আজ ৩১ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। ১৯৬৩ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মেছিলেন তিনি। অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শেষে বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ শুরু করেন। পরে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসেন এবং ১৯৯২ সালে হীরের আংটি দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক ঘটে।

তবে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় মোড় আসে উনিশে এপ্রিল দিয়ে। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা ফিচার ফিল্মের সম্মান পায় এবং ঋতুপর্ণ ঘোষকে বাংলা সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

নারীর গল্পকে দিয়েছিলেন আলাদা গুরুত্ব

ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী দিক ছিল নারী চরিত্র।

দহন, বাড়িওয়ালি, উৎসব, চোখের বালি কিংবা তিতলি , বিভিন্ন ছবিতে তিনি নারীর আবেগ, সম্পর্ক, একাকিত্ব, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁর সিনেমায় নারী শুধু গল্পের একটি চরিত্র ছিলেন না; অনেক সময় তিনিই হয়ে উঠেছেন গল্পের কেন্দ্র।

দহন, বাড়িওয়ালি, উৎসব, চোখের বালি কিংবা তিতলি

‘চোখের বালি’ থেকে ‘রেইনকোট’

ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার পরিধি শুধু বাংলা চলচ্চিত্রেই আটকে থাকেনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে ঐতিহাসিক সময়ের সম্পর্ক ও আবেগকে তিনি নতুনভাবে পর্দায় তুলে ধরেন। পরে হিন্দি ভাষায় Raincoat নির্মাণ করেন, যেখানে অজয় দেবগন ও ঐশ্বরিয়া রাই অভিনয় করেন।

‘চোখের বালি’ থেকে ‘রেইনকোট’

এছাড়া The Last Lear এর মতো ইংরেজি ভাষার ছবিও নির্মাণ করেছেন তিনি। অর্থাৎ বাংলা চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর কাজ পৌঁছে যায় আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে।

শুধু পরিচালক নন, ছিলেন অভিনেতা ও উপস্থাপকও

ঋতুপর্ণ ঘোষকে শুধু পরিচালক হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়।

তিনি লেখালেখি করেছেন, অভিনয় করেছেন এবং টেলিভিশনেও উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। Arekti Premer GolpoMemories in March এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের আলাদা করে নজর কাড়ে। পাশাপাশি তাঁর উপস্থাপনায় সেলিব্রিটি টক শোগুলোও জনপ্রিয় হয়েছিল।

 Arekti Premer Golpo ও Memories in March

নিজের পরিচয় নিয়েও ছিলেন অকপট

ঋতুপর্ণ ঘোষের ব্যক্তিজীবন এবং তাঁর শিল্পীসত্তা , দুটিকে আলাদা করে দেখা কঠিন। নিজের পরিচয়, পোশাক, ভাবনা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে তিনি কখনো প্রচলিত সামাজিক ধারণার কাছে নিজেকে আটকে রাখেননি। তাঁর পরবর্তী সময়ের কাজগুলোতেও লিঙ্গ, পরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো বিষয় উঠে এসেছে। Chitrangada: The Crowning Wish এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

Chitrangada The Crowning Wish

জাতীয় পুরস্কার থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ক্যারিয়ারে ঋতুপর্ণ ঘোষ একাধিক জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। উনিশে এপ্রিল, দহন, চোখের বালি, অন্তরমহল, আবহমানসহ তাঁর একাধিক কাজ সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তাঁর সিনেমা সম্মানিত হয়েছে।

উনিশে এপ্রিল, দহন

২০১৩ সালে থেমে যায় পথচলা

২০১৩ সালের ৩০ মে কলকাতায় মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মারা যান ঋতুপর্ণ ঘোষ। মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র Satyanweshi এর শুটিং শেষ হয়েছিল বলে জানা যায়।

তাঁর চলে যাওয়ার এক যুগেরও বেশি সময় পরেও তাঁর সিনেমা নিয়ে আলোচনা থামেনি। কারণ ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধু গল্প বলেননি , মানুষের সম্পর্কের ভেতরের নীরবতা, দ্বন্দ্ব আর না-বলা কথাগুলোকে দৃশ্যমান করেছিলেন।

সেই কারণেই বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তাঁর নাম শুধু একজন সফল পরিচালকের তালিকায় নয়; বরং একটি আলাদা চলচ্চিত্রভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই প্রশ্নটা শুধু ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ কতগুলো সিনেমা বানিয়েছিলেন?’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো , তাঁর মতো করে মানুষের গল্প আর কে বলতে পেরেছেন?

Related posts

ইয়াঙ্গুন দূতাবাসের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রি. জে. তাফহীমুল

News Desk

মহাসমাবেশ থেকে ইসলামী আন্দোলনের ১৬ দফা ঘোষণা

brs@admin

চারবার ফোন করেছেন ট্রাম্প, ধরেননি মোদি; জার্মান পত্রিকার প্রতিবেদন

News Desk

ফ্যাসিস্ট শাসনামলের জঙ্গি নাটক নিয়ে বই ‘ডার্ক ডকট্রিন’

News Desk

লুকানো নয়, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন উপহার দিতে চাই

News Desk

এদেশে জাতিসংঘের আঞ্চলিক অফিস কেন, আজহারীর প্রশ্ন

News Desk
Translate »