২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সিতে আর দেখা যাবে না ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকাকে। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো ৫ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। পুরুষ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচ ও গোল, দুই বিভাগেই সর্বোচ্চ রেকর্ড এখন তাঁর দখলে।
২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল ১৮ বছর বয়সী রোনালদোর। সেই শুরু। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে গড়েছেন একের পর এক কীর্তি।
ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে প্রতিটি আসরেই গোল করেছেন তিনি। বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ও একমাত্র ফুটবলার রোনালদো। ছয় আসরে তাঁর গোলসংখ্যা ১১।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও রোনালদোর অর্জন অসাধারণ। ছয়টি আসরে অংশ নিয়ে খেলেছেন ৩০ ম্যাচ, করেছেন ১৪ গোল। ইউরোর ইতিহাসে ম্যাচ ও গোল, দুই বিভাগেই সর্বোচ্চ রেকর্ড তাঁর।
তবে ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরেও পর্তুগালের হয়ে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্য ২০১৬ সালের ইউরো জয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উৎসাহ দিয়ে গেছেন।
শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরা হয় পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে জিতেছেন উয়েফা নেশনস লিগ। জাতীয় দলের হয়ে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের কীর্তি নিয়েই বিদায় নিচ্ছেন তিনি।
ক্লাব ফুটবলেও রোনালদোর ক্যারিয়ার রেকর্ডে ঠাসা। স্পোর্টিং লিসবন থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এসে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে নিজেকে চিনিয়েছেন বিশ্বকে।
এরপর ২০০৯ সালে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল করেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ মোট ১৬টি শিরোপা।
রিয়াল মাদ্রিদ অধ্যায়ের পর জুভেন্টাসে পাড়ি জমান এই পর্তুগিজ তারকা। ইতালিয়ান ক্লাবটির হয়ে প্রথম মৌসুমেই জেতেন লিগ শিরোপা। এরপর আবার ফেরেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে।
ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় শুরু করেন সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে। ক্লাব ও লিগ বদলালেও গোল করার ধারায় ভাটা পড়েনি তাঁর।
চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসেও রোনালদো এক অনন্য নাম। প্রতিযোগিতাটিতে ১৮৩ ম্যাচে ১৪০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি।
এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৭ গোলের রেকর্ডও তাঁর। সাতবার হয়েছেন আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ব্যক্তিগত পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে পাঁচটি ব্যালন ডি’অর ও চারটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাব ক্যারিয়ার এখনো শেষ হচ্ছে না রোনালদোর। ২৯ অক্টোবর আল খুলুদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর তাঁর ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮৫-তে।
অর্থাৎ এক হাজার গোলের মাইলফলক ছুঁতে প্রয়োজন আর মাত্র ১৫টি গোল। আল নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ায় সেই মাইলফলক স্পর্শের সুযোগ থাকছে তাঁর সামনে।
তবে ক্যারিয়ারের ঝুলিতে একটি বড় আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে। পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন, পর্তুগালকে ইউরোপসেরা করেছেন, জিতেছেন নেশনস লিগও। কিন্তু বিশ্বকাপের শিরোপা ছোঁয়া হয়নি কখনো।
২০২৬ বিশ্বকাপেই শেষবারের মতো এই আসরে খেলেছেন তিনি। শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়।
মাদেইরা থেকে উঠে আসা যে তরুণ একদিন পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন, তিনিই হয়ে উঠেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা পুরুষ ফুটবলার। রেকর্ড ভাঙবে, নতুন তারকা আসবে, কিন্তু পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছরের এই অধ্যায় ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা নিয়েই থাকবে।




