ক্ষমা চাইলেন ইনফান্তিনো
ইনফান্তিনোর ক্ষমা প্রার্থনা, তবুও ফিফা সভাপতির পদে বহাল । ফিফার ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি ঘিরে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হওয়া সমালোচনার পর তিনি নিজের সিদ্ধান্তে ‘ভুল’ ছিল বলে স্বীকার করেছেন।
তবে ক্ষমা চাইলেও নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসছে না। মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত ফিফার ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের বৈঠকে ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। ফলে আপাতত ফিফা সভাপতির পদেই বহাল থাকছেন তিনি।
কী নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক?
ফিফা সম্প্রতি FIFA Forward Enterprise (FFE) নামে একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। অভিযোগ ওঠে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি।
এ নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা সরাসরি জানিয়ে দেয়, তারা ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারিয়েছে। উয়েফার ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ,‘ অস্বচ্ছ, পর্দার আড়ালের একটি চুক্তি ’
ফিফার ভেতরেও ছিল অসন্তোষ
সমালোচনা শুধু বাইরের সংগঠন থেকেই আসেনি, ফিফার অভ্যন্তরেও এই পরিকল্পনা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। ফিফার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তায় পুরো ঘটনাকে ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে বুধবারের বৈঠক শেষে চিত্র বদলে যায়। ফিফার ম্যানেজমেন্ট বোর্ড এবং গ্রাফস্ট্রম যৌথভাবে ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থনের ঘোষণা দেন।
ভুল স্বীকার করলেন ইনফান্তিনো
বৈঠকের পর ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রম যৌথভাবে ফিফার সহ-সভাপতি, কাউন্সিল সদস্য এবং ২১১টি সদস্য দেশের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠান।
সেখানে তারা স্বীকার করেন, পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু ভুল হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি আর না তৈরি হয়, সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন।
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলো যাতে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে বলে মনে না করে, সে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা উচিত ছিল।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর যেভাবে বিষয়টি সামাল দেওয়া হয়েছে, সেখানেও ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছে সংস্থাটি।
৪০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন
বিতর্কের অন্যতম কারণ ছিল সদস্য দেশগুলোর জন্য দেওয়া একটি আর্থিক প্রস্তাব। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলো FFE প্রস্তাবে সমর্থন দিলে প্রত্যেককে প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার কথা ছিল।
সমালোচকদের অভিযোগ, এত বড় আর্থিক প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। এই বিষয়টিও সাম্প্রতিক বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
সমালোচনার জবাবে কঠোর অবস্থানে ফিফা
ক্ষমা চাইলেও নিজেদের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি ফিফা। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের সুশাসন, স্বচ্ছতা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফিফার দাবি, সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষায় তারা আরও কঠোর হবে।
মরক্কোকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক
বিতর্কের মধ্যেই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম The Times এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মরক্কোর সমর্থনের বিনিময়ে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে ফিফা তাৎক্ষণিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এমন দাবি ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’। স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো যৌথভাবে আয়োজন করতে যাওয়া ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
আপাতত সংকট কাটালেও চাপ রয়ে গেল
ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সমর্থন পাওয়ায় আপাতত সভাপতির পদ নিয়ে কোনো ঝুঁকিতে নেই জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে এই বিতর্ক ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা এবং সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে ফিফার বড় যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার চাপ থাকবে। অন্যথায়, এমন বিতর্ক আবারও সামনে আসতে পারে।



