সোমবার, মে ১১, ২০২৬
BRS TIMES
দীর্ঘ  ৬ বছরেও মেরামত হয়নি  বিধ্বস্ত একটি সড়ক
সারাদেশ

দীর্ঘ ৬ বছরেও মেরামত হয়নি  বিধ্বস্ত একটি সড়ক,

দীর্ঘ  ৬ বছরেও মেরামত হয়নি  বিধ্বস্ত একটি সড়ক । ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হওয়ার ছয় বছর পরও মেরামত হয়নি সাত গ্রামের মানুষের চলাচলের প্রধান সড়কটি। ভাঙা সড়কের স্থানে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিনেও সড়কটি সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম দুর্ভোগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের সময় জলোচ্ছ্বাসের প্রবল স্রোতে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরের গড়ইমহল সড়কের একটি বড় অংশ ভেঙে যায়। এরপর থেকে সড়কটি আর স্থায়ীভাবে মেরামত করা হয়নি। দীর্ঘ পাঁচ বছর নৌকায় যাতায়াত করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান কয়েক গ্রামের মানুষ। পরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য সহযোগিতা ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।

এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন সাত গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করেন। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও রোগীবাহী যানবাহনের জন্য এটি একমাত্র সহজ যোগাযোগপথ। তবে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন,

“ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে আমাদের ৭৬ শতক ভিটাবাড়ি মাত্র ১৫ মিনিটে বিলীন হয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে আমরা দীর্ঘ ১১ মাস সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সব কষ্ট আমরা সহ্য করেছি। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ হচ্ছে আমাদের সন্তানরা। তাদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর সুযোগই হচ্ছে না, কারণ আমরা একটি ভালো রাস্তা পাচ্ছি না। এক বছর হলো চেয়ারম্যান আমাদের একটি বাঁশের সাঁকো দিয়েছেন। সামনের বর্ষাকাল এটি টিকবে কি না জানি না। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি, যেন আমাদের সন্তানরা একটি নিরাপদ রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মালেক  গাজী বলেন,

“ছয় বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি, কিন্তু সড়ক আর ঠিক হচ্ছে না। বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আগে আমাদের সাঁকোও ছিল না, নৌকায় পারাপার হতে হতো। রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন ১০ টাকা করে দিয়ে নৌকা পার হয়ে মসজিদে মক্তবে পড়তে যেতে হয়েছে। স্কুলে যাওয়ার জন্যও টাকা দিয়ে পার হতে হয়। যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কেউ অসুস্থ হলে হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়। আমাদের মনে হয়, আমরা যেন অন্ধকার এক জনপদে বসবাস করছি। বৃদ্ধ মানুষগুলো কোথাও যেতে পারেন না। যদি বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ হয়, তাহলে স্ত্রী-সন্তানদের কোলে নিয়ে বসে থাকা ছাড়া বের হওয়ার কোনো উপায় থাকবে না।”
নাকনা গ্রামের বাসিন্দা ডা. নিহার সরকার বলেন,

“প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনাইটেড একাডেমি হাই স্কুল, এপিএস ডিগ্রি কলেজ, প্রতাপনগর এবিএস ফাজিল মাদ্রাসা, আল-আমিন মহিলা মাদ্রাসা, ফুলতলা ও তালতলা বাজারে যাওয়ার প্রধান স্থলপথ এটি। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করে। রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেন দ্রুত এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।”

স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা জানায়, বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী যাতায়াতের সময় নিচে পড়ে আহতও হয়েছে। তারা দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়লে শিশু ও বৃদ্ধদের পারাপার করানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেও তারা কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি। দ্রুত সড়কটি সংস্কার না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এ বিষয়ে প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন,
“কুড়িকাহুনিয়ার কাঁঠালতলা থেকে মকবুল দোকানদারের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭০০ ফুট রাস্তা বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি দিয়ে পারাপারে মানুষের খুব ভোগান্তি হচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে কুড়িকাহুনিয়া, সনাতনকাঠি, নাকনা, গোকুলনগর, গোয়ালকাটি ও শ্রীপুরসহ সাত গ্রামের মানুষ চলাচল করে। রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ার আগে এটি হিয়ারিং বাঁধের রাস্তা ছিল। এখানে কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করা হোক।”
আশাশুনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম বলেন,
“প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের পাশের একটি রাস্তা ওয়াশ আউট হয়ে গভীর খাদ সৃষ্টি হয়। এলজিইডির বাজেট স্বল্পতার কারণে তখন স্থায়ীভাবে কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় প্রায় ৭০০ ফুট দীর্ঘ একটি অস্থায়ী ভাসমান বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। সাঁকোটি নষ্ট হয়ে গেলে এবং স্থানীয়ভাবে চাহিদা থাকলে ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে আবারও মেরামত করা হবে। জায়গাটি অনেক গভীর হয়ে গেছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ মাটি ভরাট করতে হবে, যা ব্যয়বহুল। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় আপাতত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
দীর্ঘ ছয় বছরের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে অবিলম্বে সড়কটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Related posts

বগুড়ায় ভটভটি উল্টে গরু ব্যবসায়ীর মৃত্যু

News Desk

চরফ্যাশনে জোড়া খুন ও মরদেহ পোড়ানোর মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

News Desk

মুন্সীগঞ্জে চার জেলের কারাদণ্ড

News Desk

বুকে গুলি চালিয়ে কোস্টগার্ড সদস্যের আত্মহত্যা

News Desk

রাজশাহীতে পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার ১৮

News Desk

শেরপুরে বাসচাপায় পথচারীর মৃত্যু

News Desk
Translate »