আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির সংস্কার শর্ত এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনার মৌলিক বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার বাস্তবায়নের সময় ও পর্যায় নিয়ে আলোচনা থাকলেও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সব চ্যালেঞ্জের সমাধান সম্ভব।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভা থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও সরকার আশাবাদী।
আইএমএফের সংস্কার শর্ত নিয়ে আলোচনা
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে। একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ না দিয়ে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চায় সরকার। আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজন বড় অঙ্কের অর্থ
দেশের ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন ও মূলধন জোগানের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ব্যাংকিং খাতে প্রতিবছর প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এ জন্য সরকার প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছে। তবে শুধু সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থের চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে আগে যে উদ্বেগ ছিল, তা অনেকটাই কমেছে। ব্যাংকে আমানত ফিরছে এবং নিট আমানতের পরিমাণ বাড়ছে। পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আবার বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
জ্বালানি খাতে বাড়তি সহায়তার প্রত্যাশা
অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেল ও গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হলে ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া অতীতের অর্থনৈতিক ঘাটতি ও বিভিন্ন চাপ কাটিয়ে উঠতে আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলার বিষয়েও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা পাওয়ার আশা করছে সরকার। এ সহায়তা অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান চাপ মোকাবিলা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আয়কর আদায়ে ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী জানান, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আয়কর আদায়ে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সময়ের সঙ্গে দেশের কর-জিডিপি অনুপাতও বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে চলমান আলোচনার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে সমাধানের পথ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।




