বিআরএস টাইমস প্রতিবেদক, ঢাকা
‘গুম আর কখনো নয়’ – আন্তর্জাতিক গুম দিবসে আব্দুল কাইয়ুম মিঠুর জোরালো দাবি । আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস উপলক্ষে দেশে আর কোনো মানুষ যেন গুমের শিকার না হন , এমন জোরালো দাবি জানিয়েছেন গুমের শিকার ও জীবিত ভুক্তভোগী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী এবং Voice of Enforced Disappeared Persons (VOED) এর সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাইয়ুম মিঠু।
তিনি গুমের প্রতিটি ঘটনার সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি স্বাধীন, কার্যকর, শক্তিশালী ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের দাবি জানান।
শনিবার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস উপলক্ষে ‘অধিকার’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে VOED-এর পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আব্দুল কাইয়ুম মিঠু বলেন, “আজ আমরা শুধু গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করতে এখানে সমবেত হইনি; আমরা সত্য, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং ‘গুম আর কখনো নয়’ , এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে একত্রিত হয়েছি।”
নিজের গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন মিঠু
নিজের গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মিঠু বলেন, ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল আনুমানিক দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকার রামপুরা থেকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারা নিজেদের প্রশাসনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। তার দাবি, ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন র্যাব-১১-এর তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিন।
তিনি বলেন, প্রথম দফায় তাকে ২৩ দিন গুম করে রাখা হয়। এ সময় তাকে প্রায় ৩/৬ ফুট আয়তনের একটি টয়লেটে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।
মিঠুর অভিযোগ, তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে মারধর করা, লোহার শিকের সঙ্গে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অশালীন কথাবার্তা ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ হুমকি দিয়ে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, গুম অবস্থায় তার পরিবার কোথাও কোনো থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত করতে পারেনি।
পরে তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দিয়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানান তিনি। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও মুক্ত জীবন ফিরে পাননি বলে উল্লেখ করেন মিঠু।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় কারাগারের গেট থেকেই তাকে আবার তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দ্বিতীয়বারের গুমের সঙ্গেও র্যাব-১১-এর কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
প্রায় তিন মাস তাকে আবার গুম করে রাখা হয়। পরে নতুন একটি মামলায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়। মামলা, আটক, গুম ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তার জীবনের প্রায় তিন বছর কেটে যায়। ২০২০ সালে হাইকোর্ট তাকে জামিন দেন বলে জানান তিনি।
গুমের পর আগের জীবনে ফেরা সহজ নয়
নিজের জীবনে গুমের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা তুলে ধরে আব্দুল কাইয়ুম মিঠু বলেন, “আমি বেঁচে ফিরেছি। কিন্তু গুমের পর একজন মানুষ আর সহজে তার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারে না।”
তিনি জানান, গুমের ঘটনায় তার শিক্ষা, পেশা, ব্যবসা, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবন গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত ছোট ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়। তার হিসাব অনুযায়ী, তিনি ও তার পরিবার প্রায় ৩ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও ভয়, মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে বড় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মিঠু বলেন, “গুম একজন মানুষকে অদৃশ্য করে, কিন্তু তার আঘাত পুরো পরিবারকে বহন করতে হয়।”
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ:
অনুষ্ঠানে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনসহ অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করেন মিঠু।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।
তিনি বলেন, যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন এবং প্রিয়জন হারিয়েছেন—তাদের আত্মত্যাগ ও ন্যায়বিচারের দাবি কখনো বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন আব্দুল কাইয়ুম মিঠু।তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। দায়মুক্তির অবসান, সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পাশাপাশি গুম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে VOED ও United for Victims of Enforced Disappearances (UVED) উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা এমন কোনো মানবাধিকার কমিশন চাই না, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।”
তার দাবি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও স্বাধীনভাবে তদন্ত করা যায়।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “যে সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, সেই সংস্থাকেই যদি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে?”
মিঠু আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের নিজেদের মাধ্যমে তদন্ত করে ভুক্তভোগীদের পক্ষে সত্য প্রতিষ্ঠার কার্যকর নজির নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলে অনেক গুমের ঘটনা ও অভিযোগ সত্যের পরিবর্তে অস্বীকারের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গুমের অভিযোগকারীদের শাস্তির বিধান নিয়েও প্রশ্ন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়ার ২১ ধারায় গুমের মিথ্যা অভিযোগের জন্য অভিযোগকারীর পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে , এমন দাবি করে মিঠু বলেন, মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও এই বিধান যেন প্রকৃত ভুক্তভোগী ও পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানোর হাতিয়ার না হয়।
তিনি বলেন, অতীতে গুম থেকে ফিরে আসা অনেক ভুক্তভোগী ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। অনেক পরিবারও প্রিয়জনের সন্ধানে কথা বলার চেষ্টা করেছে।
অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ভয় তৈরি হলে ভবিষ্যতে অনেক পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় মুখ খুলতে সাহস নাও করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনের দাবি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণ কার্যকরী, আর্থিক, প্রশাসনিক ও তদন্তগত স্বাধীনতা দেওয়ার দাবি জানান মিঠু।তিনি বলেন, কমিশনার নিয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, যোগ্যতাভিত্তিক, বহুত্ববাদী, অংশগ্রহণমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের কমিশনে অর্থবহ প্রতিনিধিত্বের সুযোগ এবং পুরো আইনকে প্যারিস নীতিমালা ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানান তিনি।
মিঠু বলেন, “মানবাধিকার কোনো সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কখনোই ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “মজলুম যখন জালিমের পথ অনুসরণ করে, তখন অন্যায়ের চেহারা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আমরা কোনো সরকারের কাছ থেকেই এমন বাংলাদেশ চাই না।”
‘আমরা শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ চাই’
আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবসে গুমের শিকারদের পাশাপাশি সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান VOED এর সেক্রেটারি জেনারেল। মিঠু বলেন, “আমরা শত্রুর সাথেও ইনসাফ চাই। আমরা চাই কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযুক্ত ব্যক্তিও যাতে গুম না হন।”
সবশেষে সত্য, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন ,
“আমরা চাই , সত্য।
ন্যায়বিচার।
জবাবদিহি।
স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান।
এবং গুম আর কখনো নয়।”



