বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের একটি টকশোতে তর্কে জড়ানোর পর এবার ফেসবুক পোস্টে একে অপরকে ইঙ্গিত করে পাল্টাপাল্টি পোস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে পৃথক ফেসবুক পোস্টে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন দুই রাজনীতিক। এর আগে সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে এটিএন নিউজের নিয়মিত আয়োজন ‘স্বাধীন সংলাপ’-এর সাম্প্রতিক পর্বে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনার সময় তাদের মধ্যে তর্ক হয়।
৪২ মিনিটের ওই আলোচনার শেষ দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপস্থাপিকা রাশেদ খাঁনকে উদ্ধৃত করে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে একটি প্রসঙ্গে যেতে চাইলে সারোয়ার তুষার রাশেদের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
একপর্যায়ে রাশেদ খাঁনকে উদ্দেশ করে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘উনি শতভাগ চ্যালেঞ্জ করে এমন অনেক কথাই বলেন। মিথ্যা কথা বলায় ওনার বিরাট… আছে।’ এরপর আলোচনা মূল বিষয় থেকে সরে যায়। জুলাই আন্দোলনে কার ভূমিকা কেমন ছিল, কে মামলা খেয়েছেন আর কে খায়নি—এসব নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন দুই বক্তা।
রাশেদের দীর্ঘ পোস্ট
টকশোর ঘটনার পর মঙ্গলবার দুপুরে ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে সারোয়ার তুষারের সমালোচনা করেন মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন। তিনি দাবি করেন, টকশোতে তিনি গঠনমূলক আলোচনা করার চেষ্টা করলেও শেষের দিকে সারোয়ার তুষার তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন।
রাশেদ খাঁনের ভাষ্য, সারোয়ার তুষার তাকে উদ্দেশ করে বলেছেন, তিনি ‘মিডিয়া দেখলে সবার আগে, আর পুলিশ দেখলে সবার পরে’ থাকতেন। এ সময় রাশেদ প্রশ্ন তোলেন, এমন কথা তাকে কারা বলেছেন।
নিজের রাজনৈতিক ভূমিকার বর্ণনা দিয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনাকে কটূক্তির মামলায় তিনি কারাভোগ করেছেন এবং ১৫ দিন রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সারোয়ার তুষার তাকে ‘জেল তো চুরির মামলায়ও হয়’ বলে মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাশেদ খাঁন আরও বলেন, ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুগপৎ আন্দোলনে তিনি রাজপথে ছিলেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনে ছাত্র না হওয়ায় নেতৃত্ব না দিলেও শেখ হাসিনা ‘মানুষ হত্যা শুরু করলে’ ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়ের কাজ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আখতার হোসেনদের সঙ্গে জাতিসংঘের বাংলাদেশ প্রতিনিধির বৈঠক তার মাধ্যমে হয়েছিল। ১৮ জুলাই তিনি প্রথম দুই সমন্বয়ক—আসিফ মাহমুদ ও আহনাফ সাঈদ খানকে—আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান এবং এ কাজে ভূমিকা রাখেন বলেও দাবি করেন। আহনাফ সাঈদ খানকে কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
রাশেদ খাঁন বলেন, ১৯ জুলাই নুরুল হক নুরকে গ্রেপ্তারের পর তার বাসায় দুইবার অভিযান চালানো হয়। এরপর তিনি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন সফল করতে রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণে কাজ করেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ৩১ জুলাই নতুন করে আন্দোলন শুরু করার লক্ষ্যে বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও আইনজীবীদের হাইকোর্টের সামনে নামার বিষয়টি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার পরামর্শের ভিত্তিতে ঠিক করা হয়েছিল। ৩ আগস্ট গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে তিনি শহীদ মিনারে যান, সমন্বয়কদের সঙ্গে কথা বলেন এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন বলেও জানান।
টকশোতে সারোয়ার তুষার তাকে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায় ছিলেন—এ প্রশ্ন করেছিলেন উল্লেখ করে রাশেদ খাঁন বলেন, তিনি জবাবে বলেছেন, তারা নির্বাসনে থেকে কাজ করেছেন। এরপর তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, সারোয়ার তুষার কোথায় ছিলেন। তুষার জবাবে ১৯ জুলাই মাঠে থাকার কথা বললেও আগে ও পরে কোথায় ছিলেন—সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাকে আক্রমণ করেন বলে অভিযোগ রাশেদের।
তার দাবি, সারোয়ার তুষার তাকে ‘বেয়াদব’ ও ‘মিথ্যুক’ বলেন। প্রথমবার তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও দ্বিতীয়বার একইভাবে ‘বেয়াদব’ বলার পর তিনি পাল্টা জবাব দেন।
তুষারের পাল্টা বক্তব্য
অন্যদিকে মঙ্গলবার দুপুরে ফেসবুকে দেওয়া পৃথক এক পোস্টে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও পাল্টা ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন সারোয়ার তুষার।
তিনি লেখেন, দেনদরবার বা লবিং করে তিনি টকশোতে যান না। টকশোতে আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য কারও মাধ্যমে অনুষ্ঠান প্রযোজকদের তদবিরও করেন না বলে দাবি করেন তিনি।
সারোয়ার তুষার আরও লেখেন, সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপ দিয়ে নিজেকে টকশোর আলোচক বানাননি তিনি। তবে এমন কিছু ‘দলছুট’ ব্যক্তির কথা তিনি জানেন, যারা সরকারি ক্ষমতার জোরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাপ সৃষ্টি করে টকশোতে যান।
তিনি লেখেন, ‘কারণ সরকারের কাছ থেকে যে খুদকুঁড়া পায়, তা হালাল করতে হবে তো!’
কারও নাম উল্লেখ না করে সারোয়ার তুষার আরও বলেন, তিনি কারও নাম নেননি, তবে ‘ঠিকই জায়গামতো গিয়ে ঢিলটা পড়বে’।
মিডিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘শতভাগ স্বাভাবিক’ দাবি করে এনসিপির এই যুগ্ম আহ্বায়ক লেখেন, বিভিন্ন সংবাদে বক্তব্য দেওয়া, টকশোতে যাওয়া বা কোথাও কথা বললে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য তিনি কোনো দেনদরবার বা তদবির করেননি। টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী, প্রধান সংবাদ সম্পাদক ও প্রযোজকরাই এর বড় সাক্ষী বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পোস্টের শেষে ইংরেজিতে তিনি লেখেন, ‘Street dogs won’t define me.’



