গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বিএনপি-জামায়াতসহ জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো ন্যক্কারজনক এ হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
তারা বলেছে, আওয়ামী দোসররা মরণ কামড় দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলে ফায়দা লুটতে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পলাতক নেত্রীর ইন্ধনে দেশে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।
ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গোপালগঞ্জে এনসিপির পূর্বঘোষিত ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে পতিত আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতকারীরা আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। এনসিপির কর্মসূচির ওপর বর্বরোচিত হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, ইউএনওসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ সদস্যদের আহত করার বর্বর ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ।
মির্জা ফখরুল বলেন, এসব দুষ্কৃতকারীকে কঠোর হস্তে দমন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ দেশে যাতে আবার ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে না পারে, সেজন্য দেশের মানুষের জানমাল রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান ফখরুল। তিনি বলেন, এর ব্যত্যয় হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আবার হুমকির মুখে পড়বে।
এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা প্রশাসনের দায়িত্ব হলেও এনসিপির কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। এটি উদ্বেগজনক। সরকারকে গোপালগঞ্জসহ বাংলাদেশের সর্বত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে খুনি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হলেও দেশ এখনো ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়নি। তারা দেশকে আবারও অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুর চালিয়েছে। বিবৃতিতে তিনি পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে নিজের ফেসবুক পেজে এ হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ এবং সরকারকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বিবৃতিতে বলেন, সারা দেশের মানুষ যখন একযোগে স্বৈরাচারী হাসিনাকে উৎখাত করেছে, তখন গোপালগঞ্জে হাজার হাজার খুন, গুম ও হাজার কোটি টাকা পাচারকারী শক্তির পক্ষে কেউ প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে দেশপ্রেমিক ছাত্র নেতৃত্বের ওপর হামলা করবে এবং তাদের অবরুদ্ধ করে রাখবে, তা মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনায় প্রশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে উল্লেখ করে চরমোনাই পীর বলেন, গোপালগঞ্জে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে—এটা তাদের অনুধাবন করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঘটনায় পরিষ্কার যে, প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপারসহ দায়িত্বে নিয়োজিতদের ব্যাপারে তদন্ত করতে হবে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সহিংসতার সুযোগ করে দিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
চরমোনাই পীর বলেন, কোনো কোনো মিডিয়া হামলাকারী ফ্যাসিবাদের দোসরদের ‘গ্রামবাসী, এলাকাবাসী’ অভিহিত করেছে। যারা এনসিপির ওপর হামলা করেছে, তারা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের আওয়ামী লীগের পান্ডা হিসেবেই প্রচার করতে হবে। যারা এ হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল, অবিলম্বে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এ ধরনের সহিংস হামলা রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি। একটি ভারতপন্থি গোষ্ঠী পলাতক নেত্রীর ইন্ধনে দেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও দেশের সার্বভৌমত্বের শত্রু উল্লেখ করে তিনি বলেন, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাওলানা আব্দুর রকিব, যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা মো. ইলিয়াস আতহারী বিবৃতিতে বলেন, সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ গোলাপগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে হামলার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করল তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। সরকারকে বলব, সারা দেশে চিরুনি অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় যে কোনো সময় দেশে অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হামলায় জড়িত সবাইকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। কর্মসূচিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ধরনের উদাসীনতা আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আজকের ঘটনাকে হালকা করে দেখা হলে ভবিষ্যতে পরাজিত শক্তি পুনর্বাসিত হতে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, দিল্লির আশ্বাসে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শক্তি এখনো আস্ফালন করে। পুলিশ হত্যার বিচারের কথা বলে নিজেরাই পুলিশের ওপর হামলা করে। এ দেশ এখন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী খুনি হাসিনার নয়, এ দেশ এখন মুগ্ধ, ওয়াসিম, আবু সাঈদের। দেশবাসী প্রস্তুতি নেন, গোপালগঞ্জকে আবু সাঈদগঞ্জ বানাতে হবে।
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো গাফিলতি থাকলে তা তদন্ত করতে হবে।
জনতা পার্টি বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মিলন এবং মহাসচিব শওকত মাহমুদ এক বিবৃতিতে বলেন, দুষ্কৃতকারীদের কঠোর হস্তে দমন ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ নেই। অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বিবৃতিতে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও গণহত্যাকারী দলের সন্ত্রাসীরা দেশে নৈরাজ্য ও সহিংসতার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনো প্রশাসনের একটি অংশ ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যশীল হয়ে কাজ করছে।
এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দল হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
বিআরএসটি / জেডএইচআর

