ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ আঘাত হানার আশঙ্কায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে উপকূলীয় ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবারের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি)।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আবহাওয়া বুলেটিনে আইএমডি জানিয়েছে, উপকূলে আঘাত হানার সময় ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এ সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বা ৮৭ মাইল পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। শক্তিশালী বাতাস, ভারী বৃষ্টিপাত এবং সম্ভাব্য জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্ধ্রপ্রদেশে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতি
ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ ও তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ ও নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ এবং পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার তাঁর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের কয়েকটি জেলায় মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৪০ কিলোমিটার বেগে বাতাসের আশঙ্কা
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ উপকূলে আঘাত হানার সময় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বয়ে যেতে পারে। এমন শক্তিশালী বাতাসে দুর্বল অবকাঠামো, কাঁচা ঘরবাড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি এবং যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
আইএমডি সতর্ক করেছে, ঝড়ের প্রভাবে খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে বন্যা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের খুঁটি উপড়ে পড়া এবং কৃষিজমিতে থাকা ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত হলে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া, জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখা এবং আবহাওয়ার সর্বশেষ সতর্কবার্তা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৪ হাজার ৭০০-এর বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে
ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশে বিশেষভাবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী ৪ হাজার ৭০০-এর বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়া কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এ ধরনের আগাম পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম অগ্রাধিকার।
শ্রীলঙ্কায় স্কুল বন্ধ, সামরিক বাহিনী সতর্ক অবস্থায়
ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায়ও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করেছে, প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চল, নদী অববাহিকা এবং নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতি বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কলম্বোভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটির সামরিক বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযান ও প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ভারত ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশেই আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম সতর্কতা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম নিয়ে উদ্বেগ
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়কে সাধারণত হারিকেন এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে টাইফুন বলা হয়। বঙ্গোপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এসব ঝড় ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত। এ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় নিয়মিতভাবে উপকূলীয় জনপদ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগব্যবস্থা ও মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে।
প্রতিবেদনে এল নিনো আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে চলতি ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এল নিনোর প্রভাব ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বা তীব্রতার ওপর কীভাবে পড়ছে, তা নির্ধারণে আঞ্চলিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাতাসের তীব্রতা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, সমুদ্রের অবস্থা এবং ঝড়ের গতিপথের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্ধার কার্যক্রম, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত এবং জনসাধারণকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান
ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ উপকূলে আঘাত হানলে অন্ধ্রপ্রদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং সরকারি আবহাওয়া বুলেটিন অনুসরণ করা জরুরি।
দুর্যোগের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানীয় জল, শুকনো খাবার, জরুরি নথি এবং মোবাইল ফোনের চার্জের ব্যবস্থা রাখার মতো প্রস্তুতি সহায়ক হতে পারে। তবে উপকূলীয় এলাকায় কর্তৃপক্ষের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি হলে বাড়িতে অবস্থান না করে নির্ধারিত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘূর্ণিঝড়টির গতিপথ, উপকূলে আঘাতের সময় এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে পরবর্তী আবহাওয়া বুলেটিনে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ মোকাবিলায় ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা এবং জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




