ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরেছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এই অভিনেত্রী।
এ সময় নিজের বাবার সঙ্গে বিমানবন্দরে দেখা যায় বাঁধনকে। তার বাবা প্রকৌশলী আমিনুল হকও মেয়েকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন বাঁধন। ওই ঘটনায় ইতালির পুলিশের ভূমিকা, নিজের নিরাপত্তা, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি নিজের আহ্বানের কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পর ইতালির পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে যথাযথ সহযোগিতা করেছে। একই সঙ্গে হামলাকারীদের উদ্দেশে কঠোর বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
‘আমাকে ২৪ ঘণ্টা সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে’
ইতালিতে হামলার ঘটনার পর দেশটির পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন বাঁধন। তিনি জানান, ঘটনার পর তাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল।
বাঁধন বলেন, তাকে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছিল। পুলিশ সদস্যরা সবসময় হোটেলের লবিতে অবস্থান করতেন এবং তিনি যে জায়গায় যেতেন, তারাও সেখানে সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হতেন।
তার ভাষায়, ‘আমাকে ২৪ ঘণ্টা সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তারা সবসময় লবিতে থাকত। আমি যে জায়গায় যেতাম, সেই জায়গাতেই সঙ্গে সঙ্গে যেত।’
অভিনেত্রী জানান, ঘটনার পর ৮ সেপ্টেম্বর ইতালির পুলিশের কাছে তিনি অভিযোগ বা মামলা করেন। ওই এলাকার পুলিশ তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘তারা আমার গায়ে হাত তুলেছেন’
হামলার ঘটনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাঁধন বিষয়টিকে শুধু মৌখিক আক্রমণ হিসেবে দেখেননি। তার দাবি, হামলাকারীরা তার শরীরে হাত তুলেছেন।
বাঁধন বলেন, যারা তার ওপর হামলা করেছেন, তারা মনে করছেন হয়তো পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু তাদের এই ধারণা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘যারা আক্রমণ করেছেন; তারা নিজেরাই সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। যারা আক্রমণ করেছেন তারা মনে করছেন যে পার পেয়ে যাবেন। তারা আমার গায়ে হাত তুলেছেন।’
হামলার ধরন বোঝাতে গিয়ে বাঁধন আরও বলেন, ঘটনাটি শুধু দূর থেকে গালাগালি, স্লোগান দেওয়া কিংবা পানি ছোড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার দাবি, হামলাকারীরা সরাসরি তার শরীরে হাত তুলেছেন।
‘তাদের এই বর্বরতা বন্ধ হতে হবে’
হামলাকারীদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে বাঁধন বলেন, এ ধরনের আচরণ বন্ধ করতে হবে। তার দাবি, হামলাকারীরা নিজেদের জন্যই অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘তাদের এই বর্বরতা বন্ধ হতে হবে। তারা তাদের জায়গা অনিরাপদ করেছেন; আমাদের না।’
বাঁধনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি হামলার ঘটনায় তার অবস্থান স্পষ্ট করেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, অন্যের ওপর আক্রমণ করে কোনো পক্ষ বা গোষ্ঠী নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারে না।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দলকানা না হওয়ার আহ্বান
বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানান বাঁধন।
তিনি তাদের দলকানা না হওয়ার অনুরোধ করেন। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য বা নির্দেশনায় উত্তেজিত হয়ে কোনো ধরনের হামলা বা সহিংসতায় জড়িয়ে না পড়ার জন্যও আহ্বান জানান এই অভিনেত্রী।
বাঁধন বলেন, রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতারা অনেক সময় অডিও বা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অনুসারীদের উসকে দিতে পারেন। কিন্তু কোনো ঘটনার পর ক্ষতির মুখে পড়তে হয় সাধারণ কর্মী-সমর্থকদেরই।
তার ভাষায়, ‘আপনার পরিবার সাফার করবেন। কিন্তু দলের যে বড় বড় নেতারা আছেন, যারা আপনাদের অডিও বার্তা, ভিডিও বার্তা দিয়ে উসকে দিচ্ছেন আপনাদের, তাদের জীবন কিন্তু আপনাদের না।’
তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিশ্রমের কথাও তুলে ধরেন। বাঁধন বলেন, তারা বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করেন এবং বাংলাদেশে অর্থ পাঠান। তাই রাজনৈতিক উসকানিতে পড়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে না ফেলার অনুরোধ জানান তিনি।
বাঁধনের ভাষায়, ‘মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আপনারা বাংলাদেশে টাকা পাঠান। আপনারা এগুলো আর প্লিজ কইরেন না।’
৮ সেপ্টেম্বর ইতালিতে মামলা
বাঁধন জানান, হামলার ঘটনার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর ইতালিতে মামলা করেছেন তিনি। ঘটনার আইনি প্রক্রিয়া সেখানকার আইন অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে ইতালিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং দেশটির সরকারের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন বাঁধন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তিনি একা ছিলেন না; ইতালির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন।
ইতালির পুলিশের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টিও তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তার দাবি, পুলিশ সদস্যরা তার চলাচলের সময়ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন বাঁধন
আজমেরী হক বাঁধন ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমা ও অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়।
উৎসবে অংশগ্রহণের সময়ই বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানিয়েছেন। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে।
হামলার পর নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। এবার দেশে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পুরো বিষয়টি নিয়ে আবারও নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন তিনি।
হামলার ঘটনা নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা
ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দৃশ্যশিল্পী সমাজের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়েও বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এসব তথ্যের চূড়ান্ত সত্যতা ও আইনি অবস্থান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর নির্ভরশীল।
বাঁধনের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ইতালিতে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন এবং তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সেখানকার আইন অনুযায়ী এগিয়ে যাবে।
হামলার পরও পিছিয়ে যাননি বাঁধন
ঘটনার পরও ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বাঁধন।
তিনি হামলার ঘটনাকে সাধারণ কোনো অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন না। বরং তার বক্তব্যে শারীরিক আক্রমণ ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তার মতে, মতের ভিন্নতা বা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কাউকে আক্রমণ করার অধিকার কারও নেই। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন রাজনৈতিক উত্তেজনায় জড়িয়ে নিজেদের ক্ষতি না করেন, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
‘তারা মনে করছেন পার পেয়ে যাবেন’
হামলাকারীদের উদ্দেশে বাঁধনের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—তারা হয়তো মনে করছেন এই ঘটনা থেকে তারা পার পেয়ে যাবেন। তবে তার দাবি, ইতালিতে মামলা হওয়ায় বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করেছেন, ঘটনাটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া বা প্রতিবাদ জানানোর পর্যায়ে নেই। তার দাবি অনুযায়ী, তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে এবং এ কারণেই তিনি পুলিশের কাছে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
বাঁধনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইতালির পুলিশ তার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং তাকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়েছে।
দেশে ফিরে বাবার সঙ্গে বাঁধন
সোমবার সকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর বাঁধনের সঙ্গে তার বাবা প্রকৌশলী আমিনুল হকও ছিলেন। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।
সেখানে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতা, হামলার ঘটনা এবং ইতালির পুলিশের সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলেন অভিনেত্রী।
হামলার বিষয়ে কথা বলার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে তার আহ্বানও আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক কোনো পক্ষের হয়ে সহিংসতায় না জড়িয়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও পরিবারের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর
ইতালিতে বাঁধনের করা মামলার পর এখন দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে।
অভিনেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ইতালির পুলিশ ইতোমধ্যে তাকে সহযোগিতা করেছে এবং নিরাপত্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসও তাকে সহযোগিতা করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে হামলার ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তের পর কী সিদ্ধান্ত আসে—এসব বিষয় এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
দেশে ফিরে বাঁধনের দেওয়া বক্তব্যে তাই একদিকে যেমন হামলার ঘটনায় তার ক্ষোভ ও কঠোর অবস্থান উঠে এসেছে, অন্যদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি রয়েছে সহিংসতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান। তার স্পষ্ট বার্তা—রাজনৈতিক মত বা দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে আক্রমণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ালে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন হামলাকারীরাই।




