BRS TIMES
যুদ্ধের বিরোধিতা করায় কারাদণ্ডের মুখে রাশিয়ার মানবিক কর্মী
অন্যান্য সংবাদআন্তর্জাতিকপ্রচ্ছদশিরোনাম

যুদ্ধের বিরোধিতা করায় কারাদণ্ডের মুখে রাশিয়ার মানবিক কর্মী

কৈশোর থেকেই অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন রাশিয়ার মানবিক কর্মী লিদা মোনিয়াভা। দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের চিকিৎসা ও সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ৩৮ বছর বয়সী নারী এখন নিজ দেশেই কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে। কারণ, তিনি রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর যুদ্ধের কারণে রাশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইউক্রেনীয়দের সহায়তায়ও এগিয়ে আসেন মোনিয়াভা। একই সময়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধেও কথা বলতে থাকেন তিনি।

চলতি মাসের শুরুতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে গৃহবন্দি রাখা হয়েছে। পায়ে পরানো হয়েছে ইলেকট্রনিক নজরদারি ডিভাইস। রুশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কয়েক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

মস্কো থেকে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ায় মতপ্রকাশের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকলেও মোনিয়াভার বিরুদ্ধে এই মামলা দেশটির নাগরিক সমাজে বিস্ময় ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

২০২৩ সালে টেলিগ্রামে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ওই পোস্টে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে জাতিসংঘের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন এবং রাশিয়ায় বসবাসরত ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সহায়তার আহ্বান জানান।

শিশুদের জন্য দীর্ঘদিনের লড়াই

রাশিয়ায় মোনিয়াভা একজন পরিচিত ও সম্মানিত মানবিক কর্মী। তার নেতৃত্বাধীন দাতব্য প্রতিষ্ঠান অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা ও সেবায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২৫ সালে তার ফাউন্ডেশন ১২০ কোটি রুবলের বেশি তহবিল সংগ্রহ করে। এই অর্থ দিয়ে শিশুদের বিনামূল্যে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বাড়িতে চিকিৎসাসেবা, নার্স ও আয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

প্রতিবন্ধী ছেলে লিওশার মা ৫০ বছর বয়সী এলেনা বাবিচ বলেন, ‘লিদার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আমার ছেলে লিওশা বেঁচে আছে।’

তিনি বলেন, এখন তার ছেলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি জীবনযাপন করতে পারছে। মোনিয়াভার প্রতিদিনের কাজকেই এর কৃতিত্ব দেন তিনি।

এলেনার ভাষায়, ‘লিদা আমাদের প্রতীক এবং আমাদের আলোর দিশা। একই সঙ্গে তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিদিন নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করেন।’

১৬ বছর বয়স থেকেই শিশুদের পাশে

মস্কোর একটি সোভিয়েত আমলের বুদ্ধিজীবী পরিবারে জন্ম মোনিয়াভার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংগঠনের মাধ্যমে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের সহায়তায় কাজ শুরু করেন তিনি।

পরে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নিলেও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর শিশুদের সেবায় পুরোপুরি নিজেকে নিয়োজিত করতে সাংবাদিকতা ছেড়ে দেন।

বেশ কয়েকটি ফাউন্ডেশনে কাজ করার পর ২০১৩ সালে মস্কোর প্রথম মুমূর্ষু শিশুদের হসপিস চালু করেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তার পরিচিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হাউস উইথ দ্য লাইটহাউস’

রাশিয়ায় অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যায় রাখার যে সামাজিক প্রবণতা রয়েছে, সেটির বিরুদ্ধেও কাজ করেছেন মোনিয়াভা। শিশুদের স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি রাখতে তাদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন তিনি।

যুদ্ধের বিরোধিতা করেও দেশ ছাড়েননি

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইউক্রেনীয়দের সহায়তায় একটি প্রকল্প চালু করেন মোনিয়াভা। যুদ্ধের প্রথম তিন বছরে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৭ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার ঝুঁকি জেনেও রাশিয়া ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি।

ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধবিরোধী একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে রুশ সেনাবাহিনীকে ‘হেয় করার’ অভিযোগে তাকে জরিমানা করা হয়। পরে তিনি লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ অশুভ। এটি ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডি। এটি একটি অপরাধ।’

দেশ ছাড়ার পরামর্শ পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি, তিনি দেশ ছেড়ে গেলে উপশমমূলক চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা অনেক শিশু অনাথ আশ্রম ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পড়ে থাকবে।

মোনিয়াভা বলেন, ‘যুদ্ধ নেই এমনভাবে আমি চুপ করে থাকতে পারি না।’

সর্বশেষ আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পরও রাশিয়া ছাড়েননি তিনি। তার ভাষায়, ঝুঁকিগুলো তিনি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন। তবে এই কঠিন সময়ে রাশিয়ায় থাকাটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রম যাতে অব্যাহত থাকে, সে জন্য তিনি পরিচালকের পদ থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন।

‘লিদা জীবনের পক্ষে’

মোনিয়াভার শুনানিতে মস্কোতে উপস্থিত ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘লিদা মোনিয়াভা জীবনের পক্ষে। আর যারা তাকে কারাগারে পাঠাতে চাইছে, তারা মৃত্যুর পক্ষে।’

যুদ্ধের আগেও রাশিয়ার উগ্র রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মোনিয়াভা।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি প্রতিবন্ধী এক ছেলে শিশুকে দত্তক নেন। শিশুটির নাম ছিল কোলিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি। ২০২২ সালে ১৩ বছর বয়সে কোলিয়া মারা যায়। এরপর এক কট্টরপন্থী আইনজীবী মোনিয়াভার বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনলেও সরকারি তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মোনিয়াভার বিরুদ্ধে সর্বশেষ আইনি পদক্ষেপকে তার সমর্থকরা চরম অন্যায় হিসেবে দেখছেন। মস্কোর এক নারী এএফপিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই রাশিয়ায় এখন সাধু-সন্তদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হচ্ছে।’

Related posts

টাকার বিনিময়ে বদলি জেল খাটতে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্টে ধরা

News Desk

খাটের নিচে মিলল জেলে পুনর্বাসনের চাল

News Desk

নেতানিয়াহুর সাথে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাৎ

News Desk

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেল নরসিংদীর লটকন

brs@admin

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা

News Desk

রোমে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা বিনিময়

brs@admin
Translate »