সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মঙ্গলবারও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা
ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে পাল্টা অবরোধ অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু তেলের দাম নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথে অবস্থিত ইরানের একটি দ্বীপে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার পর আবারও বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদেরকে কঠোরভাবে আঘাত করব।’
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও পরোক্ষভাবে এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরান যাতে মাইন পুঁতে রাখতে না পারে, তা ঠেকাতে লারাক দ্বীপে রকেট নিক্ষেপের স্থানগুলোতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে ইরান জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর নতুন করে এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো, বন্দর ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা চাপ অব্যাহত রাখব। এরই মধ্যে এখানে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে।’
উত্তর ক্যারোলাইনায় জি-২০ বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই চাপ প্রয়োগের অভিযানে বড় ধরনের পরিবর্তন ‘কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে’ আসতে পারে।
বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুই আন্তর্জাতিক বাজারদরই বেড়েছে। এর ফলে আগের দিনের ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তেলের দাম দ্রুত আরও বেড়ে যেতে পারে। সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটও তৈরি হতে পারে।
ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের বিশ্লেষক রদ্রিগো ক্যাত্রিল বলেন, ‘প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোর নিয়ন্ত্রিত ধরন থেকে মনে হচ্ছে, কোনো পক্ষই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ফিরতে সক্রিয়ভাবে আগ্রহী নয়। তবে আলোচনা থমকে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার কৌশলগত গুরুত্ব পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রেখেছে।’
বিশ্লেষকের এই মন্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রিত থাকলেও কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ে রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়ায় বিষয়টি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প।
জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে।
এশিয়ার বেশির ভাগ শেয়ারবাজারেও মঙ্গলবার নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের আগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ফেডের বৈঠক ১৬ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা।
টোকিও, হংকং, সিউল, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ওয়েলিংটনের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। তবে তাইপে, ম্যানিলা ও জাকার্তার বাজারে সূচক বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও ভোক্তা মূল্যসূচক-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের দিকে। এসব তথ্য সুদের হার নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুদের হার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
শুক্রবার ফেডের প্রধান কেভিন ওয়ার্শের সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে কঠোর অবস্থানের বক্তব্যের পর সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে প্রত্যাশা বেড়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের সুদ বাড়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়লে সাধারণত ঋণের খরচ বেড়ে যায় এবং বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর প্রভাব এশিয়ার বাজারেও পড়েছে। সোমবার জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শেইনের শেয়ারে বড় পতন
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত হংকং শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরুর দিনে ফাস্ট-ফ্যাশন পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান শেইনের শেয়ারের দাম ৯ শতাংশের বেশি কমেছে।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ১৭০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিল। তবে লেনদেন শুরুর দিনেই শেয়ারের দামে বড় ধরনের পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্ববাজারে সামগ্রিক অস্থিরতা, ভোক্তা ব্যয়ের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবও কোম্পানিটির শেয়ারে পড়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এনভিডিয়ার বিনিয়োগে মিডিয়াটেকের শেয়ার বাড়ল
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা মিডিয়াটেকে ৩৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই খবরের পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে উন্নত চিপের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। এই খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার—এই চারটি বিষয় বর্তমানে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত না হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আর তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিবর্তে আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হতে পারে।
ফলে আগামী দিনগুলোতে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বন্ড মার্কেট এবং মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে।



