ভূমিকম্প, হিমবাহ ধস নাকি অন্য কোনো কারণ
নেপালে হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পেছনে আসলে কী কাজ করেছে , তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় কয়েক মিনিটের মধ্যে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল নিচের দিকে নেমে আসে। প্রবল সেই স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও যানবাহন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নেপালে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস কেন? ভূমিকম্প, হিমবাহ ধস নাকি অন্য কোনো কারণ, আসুন জেনে নেওয়া যাক।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প, হিমবাহ বা পাথুরে বরফধস এবং নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধ , এই কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে।
ভূমিকম্প নাকি ভূমিধস – কোনটি আগে ঘটেছিল?
নেপাল প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা ছিল, তিব্বত এলাকায় হওয়া ভূমিকম্পের জেরে ভূমিধস ও পরবর্তী আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটতে পারে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালও এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। সংস্থাটি জানায়, এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূকম্পন রেকর্ড হলেও সেটি ভূমিধসের কারণ না-ও হতে পারে। বরং বিশাল ভূমিধসের কারণেই ভূকম্পনের মতো কম্পন তৈরি হয়েছিল , এমন সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থাৎ, ভূমিকম্প থেকে ভূমিধস নাকি ভূমিধস থেকেই কম্পন , এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

হিমবাহ বা বরফধসের সম্ভাবনাই বেশি?
ভূবিজ্ঞানী ও পাহাড়ি পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের ধারণা, তিব্বত অংশে পাথুরে বরফধস বা হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, বিশাল একটি বরফ ও পাথরের অংশ নদীতে পড়ে এর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেয়।
ফলে অল্প সময়ের মধ্যে নদীর উজানে বিপুল পরিমাণ পানি জমতে থাকে। পাহাড়ি এলাকায় এভাবে নদীর পথ বন্ধ হয়ে গেলে অনেকটা প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে আসে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই ধরনের স্রোত সাধারণ বন্যার পানির মতো নয়। কাদা, পাথর ও অন্যান্য উপাদান মিশে এটি অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
বৃষ্টি ছাড়াই কেন এত বড় বন্যা?
এই ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, দুর্যোগের আগে ঘটনাস্থল ও আশপাশে খুব বেশি বৃষ্টিপাত হয়নি। তাই প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস পাওয়া কঠিন ছিল।
পাহাড়ি এলাকায় বরফধস বা ভূমিধসে নদীর গতিপথ আটকে গেলে উজানে পানি জমে থাকতে পারে। পরে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কোনো ভারী বৃষ্টি ছাড়াই হঠাৎ নিচের দিকে ভয়াবহ ঢল নামতে পারে।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন আকস্মিক পাহাড়ি বন্যা মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। স্রোত শুরু হওয়ার পর দৌড়ে বা গাড়িতে পালানোর সময় অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় দফা ঢলের আশঙ্কা
দুর্যোগের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উজানের কোনো অংশে নদীর প্রবাহ এখনো আংশিকভাবে আটকে থাকতে পারে। সেখানে জমে থাকা পানি আবারও নিচের দিকে নেমে এলে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের ঢল দেখা দিতে পারে।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাহাড়ি নদী ও নিচু এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো ভূমিকা আছে?
এই নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই। এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্তারিত গবেষণা করবেন।
তবে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং স্থায়ী বরফের স্তর দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ভূমিধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই হিমবাহের হ্রদ ফেটে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও এবারের ঘটনায় হিমবাহের কোনো হ্রদ ভেঙেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

একাধিক জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
এই পাহাড়ি বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাবে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানসহ নেপালের একাধিক জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক শ তীর্থযাত্রীর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।
নেপালের জন্য নতুন সতর্কবার্তা
হিমালয়ের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগের কারণ সব সময় একক নয়। ভূমিধস, বরফধস, নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং ভূমিকম্প , সবকিছু মিলিয়েই বড় বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
নেপালের সাম্প্রতিক এই দুর্যোগের প্রকৃত কারণ জানতে আরও সময় লাগবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত পরিবেশ এবং অস্থিতিশীল পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ভবিষ্যতে এমন আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
এখন বিজ্ঞানীদের মূল কাজ হলো, ঘটনাস্থলের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঠিক কীভাবে এই ভয়াবহ ঢল তৈরি হলো তা নিশ্চিত করা। সেই উত্তর মিললে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।


