এক হাতে বই, অন্য হাতে খুন্তি-কোদাল—দৃশ্যটি কোনো কৃষকের মাঠের নয়, কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। যখন মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনে ডুবে থাকছে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ, তখন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা কলেজের শিক্ষার্থীরা বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ।
মোবাইলের স্ক্রিন ছেড়ে তারা এখন নেমেছে ফসলের মাঠে। হাতে তুলে নিয়েছে কোদাল, কাস্তে ও কৃষির নানা সরঞ্জাম। শিখছে মাটি তৈরি, বীজ বপন, চারা উৎপাদন, পরিচর্যা ও নিরাপদ সবজি চাষের কৌশল। শুধু কলেজের মাঠেই নয়, শেখা কৃষিজ্ঞান কাজে লাগিয়ে অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতেও গড়ে তুলছে সবজি বাগান।
স্ক্রিনে নয়, এবার মাঠেই ‘ক্লাস’
মধুপুরের প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা মহিষমারা। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, বিল আর আনারসের বাগান। এই কৃষিনির্ভর এলাকাতেই ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মহিষমারা কলেজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের শ্রেণিকক্ষে চলছে নিয়মিত পাঠদান। এর পাশেই উৎপাদনমুখী শিক্ষা কর্নারে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী ব্যস্ত কৃষিকাজে। কেউ মাটি প্রস্তুত করছে, কেউ বীজ বুনছে, আবার কেউ পরিচর্যা করছে সবজির চারা।
শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কৃষিকাজ শেখাচ্ছেন কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন।
৪০ শতাংশ জমিতে শিক্ষার্থীদের কৃষিশিক্ষা
কলেজের পূর্ব পাশে প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে উৎপাদনমুখী শিক্ষা কর্নার। ২০১৮ সাল থেকে এখানে শিক্ষার্থীদের কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে।
বিভিন্ন মৌসুমের সবজি, ফল ও মসলার চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে মাটি প্রস্তুত, বীজ বপন, পরিচর্যা ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কৌশল শেখানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব জীবনে কাজে লাগে—এমন শিক্ষা দেওয়াই এ কার্যক্রমের লক্ষ্য।
কৃষকের হাতেই গড়ে উঠল কলেজ
মহিষমারা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছানোয়ার হোসেন নিজেও একজন সফল কৃষক। ১৯৯২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর সিলেটের একটি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর গ্রামে ফিরে শিক্ষকতা করেন আরও দুই বছর।
কিন্তু কৃষির প্রতি টান তাকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে কৃষিকাজে নিয়ে আসে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস, কলা, হলুদ, ভুট্টা, মাল্টা, ড্রাগন ফল, পেয়ারা ও কফিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে সফলতা পান তিনি।
নিজ এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে বাবার ৯৫ শতাংশ ও নিজের ৪০ শতাংশ—মোট ১৩৫ শতাংশ জমির ওপর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মহিষমারা কলেজ। ২০২২ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন ১৮ জন শিক্ষক।
‘শেখা কৃষি বাড়িতেও কাজে লাগাচ্ছে শিক্ষার্থীরা’
কলেজের শিক্ষার্থীরা জানায়, কৃষিশিক্ষার মাধ্যমে তারা কীটনাশকমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনের নানা কৌশল শিখেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাড়িতেও অনেকে সবজি চাষ করছে।
এক শিক্ষার্থী বলেন, কলেজে কৃষিকাজ শেখার পর বাড়িতে নিজেরাই সবজি আবাদ করছেন। এতে পরিবারের সদস্যরাও খুশি। ভবিষ্যতে কেউ কৃষি কর্মকর্তা, আবার কেউ কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
শিক্ষকরা বলছেন, কমছে মোবাইল আসক্তি
মহিষমারা কলেজের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ক্লাসের বিরতিতে ও ছুটির পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে কৃষিকাজে যুক্ত করা হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা হাতে-কলমে কৃষির নানা বিষয় শেখে। শিক্ষার্থীরাও আনন্দের সঙ্গে এতে অংশ নেয়।
কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শিক্ষার্থীদের কৃষি উৎপাদনমুখী শিক্ষায় যুক্ত করার ফলে তারা মোবাইল-ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে কিছুটা দূরে থাকছে। একই সঙ্গে বাড়িতে মা-বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করার মানসিকতাও তৈরি হচ্ছে।
‘চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে পারবে’
মহিষমারা কলেজের সভাপতি ও মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণেই প্রান্তিক পর্যায়ের এই কলেজ অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষাজীবন শেষ করলেই চাকরি পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণ নিলে শিক্ষার্থীরা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। ভবিষ্যতে তারা কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে থাকা সময়কে এবার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে মহিষমারা কলেজের শিক্ষার্থীরা। বইয়ের পাতার পাশাপাশি মাঠে নেমে কৃষি শেখার এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে উৎপাদনমুখী করার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।



