জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পও রয়েছে।
আজ বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা সরকারি অর্থায়ন, ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ এবং ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসবে।
অনুমোদিত ১৩ প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প রয়েছে।
সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
একনেকে অনুমোদিত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো ‘রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এর আওতায় বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, দেশের প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো।
প্রকল্পে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং পাওয়ার সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অর্থায়ন করা হবে।
পাওয়ার সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ঋণের সুদের হার হবে ২ শতাংশ। এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৬ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
৯১৮ একর জমিতে হবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালের ব্লক-বি এলাকায় বিপিডিবির আগে থেকেই অধিগ্রহণ করা ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমিতে নির্মাণ করা হবে।
নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন না হওয়ায় প্রকল্পটির ব্যয় তুলনামূলক কম হবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, ব্লক-বিতে ভূমি উন্নয়ন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রামপালের নিকটবর্তী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামোর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এতে তুলনামূলক দ্রুত ও কম ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য
পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে। এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা মিলবে।
এ ছাড়া প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।
একনেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাত প্রকল্প
বুধবারের একনেক সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাতটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডে সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
- রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন।
- রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন।
- গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনে রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ।
- সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি।
- সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন।
- গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধনী।
৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কিনবে রেলওয়ে
একনেক সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় এসব লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে।
এ ছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসে বাংলাদেশ চ্যান্সারি ভবনের আধুনিকায়ন
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয়কৃত চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করতে সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভজনপুর (নিজবাড়ী)-আটোরখাড়ি-ময়নাগুড়ি-আমতলী-মিরগড়-পঞ্চগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী।
নন্দাহার ও খাল পুনঃখনন প্রকল্পের তথ্য উপস্থাপন
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ‘জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল এবং খাড়োয়া খাল পুনঃখনন’ প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




