জনগণের আট দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে আন্দোলন এক দফায় পরিণত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে আন্দোলন আরও কঠোর হতে পারে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের বিভিন্ন পথসভা ও সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে শুরু হয়ে লংমার্চটি গাজীপুর, টাঙ্গাইল হয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পর্যন্ত যায়। বিভিন্ন পথসভায় জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বক্তব্য দেন।
ঢাকার সমাবেশে এক দফার হুঁশিয়ারি
শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, জনগণের দাবি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আট দফা দাবি প্রয়োজনে নয় বা ১০ দফায় পরিণত হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় তা এক দফায় পরিণত হতে পারে।
তার ভাষ্য, এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, দাবি মানতে ব্যর্থ হলে কোনো ধরনের ‘চোখ রাঙানি’ কাজে আসবে না এবং তারা কোনো কিছু পরোয়া করবেন না।
তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কোনো দলীয় দাবি নিয়ে মাঠে নামেনি; বরং ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। দাবি আদায় করেই তারা ঘরে ফিরবেন বলে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির।
উদ্বোধনী সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, আমার বাংলাদেশ পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু এবং জোটভুক্ত অন্যান্য দলের নেতারা।
গাজীপুরে ৮ দফা এক দফায় পরিণত হওয়ার কথা
এরপর লংমার্চের পথসভা অনুষ্ঠিত হয় গাজীপুরের ভোগরা বাইপাসে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে আয়োজিত ওই পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের রায় বাস্তবায়নে বিএনপিকেও একসময় বাধ্য হতে হবে।
তিনি বলেন, তারা কোনো দলীয় দাবি নিয়ে সেখানে যাননি। জনগণের দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্যই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে।
গাজীপুরের পথসভায় জামায়াত আমির লংমার্চের বিভিন্ন দাবির কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি বন্ধ, দুর্নীতি দূর করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য আট দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। তবে জনগণের প্রয়োজনে এই আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মুহা. জামাল উদদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পথসভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এলডিপির সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ, আমার বাংলাদেশ পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বক্তব্য দেন।
টাঙ্গাইলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে বক্তব্য
লংমার্চের পরবর্তী পথসভা হয় টাঙ্গাইলের নগর জলফৈ বাইপাস রোডে। শনিবার দুপুরে সেখানে বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জনগণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। তার ভাষ্য, এই লড়াই ১৮ কোটি মানুষের জন্য এবং জনগণের দাবি আদায় করেই তারা ঘরে ফিরবেন। তিনি বলেন, মাঝখানে কোনো বিশ্রাম বা বিরতি নেই; আন্দোলনের কাফেলা চলতে থাকবে।
টাঙ্গাইলের পথসভায় তিনি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় উঠে আসে।
শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ ভোটের রায় দিয়েছে বলে তারা দাবি করেন, কিন্তু সেই রায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসক নিয়োগ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না করার মাধ্যমে সরকার জাতির সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না বলে তারা মনে করেন।
টাঙ্গাইলের পথসভায় এলপিজির দাম নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আগে যে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০০ টাকার মতো ছিল, তা এখন ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে—এমন দাবি তুলে তিনি বলেন, এসব অধিকার আদায়ের জন্যই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।
‘দাবি ৮ দফা থেকে এক দফায় যেতে পারে’
টাঙ্গাইলে শফিকুর রহমান আবারও বলেন, তাদের ছয় দফা এখন আট দফায় পরিণত হয়েছে। জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী দাবি আরও বাড়তে পারে। আবার জনগণের প্রয়োজন হলে সব দফা বিলুপ্ত করে এক দফা ঘোষণা করার প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি লংমার্চে অংশ নেওয়া মানুষের উদ্দেশে বলেন, সেদিনের লংমার্চ তাদের দিকে যাচ্ছে, আর ভবিষ্যতের লংমার্চ এখান থেকে ঢাকার দিকে যেতে পারে। এ সময় তিনি আন্দোলনের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
পথসভায় নারী অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতির কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, প্রচণ্ড রোদে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও তাদের দাবির পক্ষে মাঠে নেমেছেন। তাদের উপস্থিতিকে তিনি আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
টাঙ্গাইলের পথসভায় জেলা জামায়াতের আমির আহসান হাবিব মাসুদের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ অন্য নেতারা।
উল্লাপাড়ায় আট দফা না মানলে আন্দোলন কঠোর করার কথা
ঢাকা-রংপুর লংমার্চের আরেকটি পথসভা অনুষ্ঠিত হয় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায়। শনিবার দুপুরে সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জনগণের আট দফা দাবি মেনে না নিলে আন্দোলন এক দফায় পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আন্দোলন আরও কঠোর হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পথসভায় তিনি লংমার্চে অংশ নেওয়া মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। প্রচণ্ড রোদ ও গরম উপেক্ষা করে মানুষ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের এই অংশগ্রহণ তাকে আশ্বস্ত করেছে। আন্দোলনে বিজয়ী হয়ে ঘরে ফেরার প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জের এই কর্মসূচিতে জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যক্ষ মো. শাহিনুর আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক এবং এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জুসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।
যেসব দাবিতে লংমার্চ
১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আয়োজিত এই ঢাকা-রংপুর লংমার্চের পেছনে আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় এসব দাবির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেন অংশগ্রহণকারী দলগুলোর নেতারা।
আন্দোলন ঘিরে নেতাদের বক্তব্য
লংমার্চের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাদের বক্তব্যে জনগণের বিভিন্ন সমস্যা ও সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা গুরুত্ব পায়। শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে দাবি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন এবং আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি আরও কঠোর হতে পারে—এমন বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, জনগণের দাবি পূরণ করা হলে আন্দোলনের প্রয়োজন থাকবে না। তবে দাবি উপেক্ষা করা হলে কর্মসূচির ধরন পরিবর্তিত হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তার বক্তব্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো বারবার উঠে আসে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জনগণের ভোটের রায় নিয়ে সরকারের প্রতি প্রশ্ন তোলেন তিনি।
লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় অংশ নেওয়া নেতারা তাদের বক্তব্যে আট দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানান। কর্মসূচিতে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরা হয়।
রাজধানী থেকে শুরু হওয়া এই লংমার্চের পথসভাগুলোতে শফিকুর রহমান ধারাবাহিকভাবে দাবি আদায়ের কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, ১১ দলীয় ঐক্যের এই কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, এলডিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। শনিবার দিনভর ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি পরিচালিত হয়।




