33.1 C
Bangladesh
Sunday, August 30, 2026
BRS TIMES
অন্যান্য সংবাদপ্রচ্ছদমতামতশিরোনাম

গুম তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষমতার দাবি অধিকার এর

গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এর ওপর ন্যস্ত করার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। একই সঙ্গে গুমের শিকার হয়ে এখনো ফিরে না আসা ব্যক্তিদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় আইনগত ও আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং গুমের পর ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব দাবি জানানো হয়।অনুষ্ঠানটি অধিকারের পরিচালক তাসকিন ফাহমিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সাজ্জাদ হোসেনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।

এতে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম, বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, এনসিপির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আল আমিন, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, UVED-এর আহ্বায়ক অ্যাম্বাসেডর এম মারুফ জামান, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী এবং VOED-এর সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাইয়ুম মিঠু, UVED এর সদস্য সচিব হুমায়ুন কবির, মোংলা কোস্টঘাট কর্তৃক গুমের শিকার মিরাজ হোসেনের পরিবারের সদস্যরা, গুমের শিকার ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যসহ আরও অনেকে।

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস

অধিকারের বক্তব্যে বলা হয়, ৩০ আগস্ট গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ’ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এটি কার্যকর হয়।

বক্তব্যে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদি সরকার সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করে। এ সময়ে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বীসহ সাধারণ নাগরিকরা গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
অধিকারের বক্তব্যে আরও বলা হয়, গোপন বন্দিশালাগুলোতে ফ্যাসিবাদি ব্যবস্থার বিরোধিতাকারী এবং ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে মূলত যারা সোচ্চার ও প্রতিবাদী ছিলেন, তাদের গুম করে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাদেশ

অধিকারের বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট ২০২৪ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৯ আগস্ট গুম হতে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ বাংলাদেশ অনুমোদন করে।

সনদ অনুমোদনের ফলে গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এর পর অন্তর্বর্তী সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সংসদে পাস না করায় ওই অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায় বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।

নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি

অধিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল পুলিশকে।
পরবর্তীতে ২৭ আগস্ট খসড়া আইনের কিছুটা পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। ওই আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী পরিচালনা করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতীত অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার অর্পণ করতে পারবে। তবে অধিকারের মতে, এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কারণ পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সরকার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে এবং তাদের তদন্ত প্রায়শই পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রতিভাত হয়েছে। অধিকার ও গুম-সংক্রান্ত ইনকোয়ারি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গুমের ক্ষেত্রে এক বাহিনী আরেক বাহিনীর নামে মানুষকে তুলে নিয়ে যেত বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। ফলে নিরপেক্ষ তদন্তের আগে কোন বাহিনী গুম করেছে, সেটি কখনোই জানা সম্ভব হয় না বলে দাবি করা হয়।

তদন্ত নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা

অধিকার বলছে, প্রস্তাবিত আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগটি আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের শিকার হতে পারেন। সংগঠনটির মতে, এর ফলে বিচারহীনতার পথ আরও প্রশস্ত হবে এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার গুমের অভিযোগ দায়ের করতে নিরুৎসাহিত হবেন।

বক্তারা বলেন, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও পরিবারকে ভয়ভীতি বা শাস্তির আশঙ্কার মধ্যে না রেখে তাদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ এ ধরনের মামলার তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল বলেও অধিকারের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও গুম নিয়ে উদ্বেগ

অধিকারের বক্তব্যে আরও বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও গুমের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংগঠনটি মনে করে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর হতে হবে।

সরকারের কাছে অধিকারের তিন দাবি

অনুষ্ঠান থেকে সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানানো হয়।
১. স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে তদন্তভার:
গুমের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার দিতে হবে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
২. নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব পরিচালনার সুযোগ:
গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেননি, তাদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার:
গুমের পর যারা ফিরে এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অথবা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। এসব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

‘গুম আর কখনো নয়’

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি, ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।

গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান, গুমের সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে গুম, নির্যাতন কিংবা বেআইনিভাবে আটক রাখার ঘটনা আর কখনো ঘটতে দেওয়া যাবে না। ‘গুম আর কখনো নয়’ এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

Related posts

বরগুনা জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

News Desk

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শুরু

News Desk

গাজা শহর দখল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভ

News Desk

পরিবহন ধর্মঘট সফল করার লক্ষে বিক্ষোভ মিছিল

News Desk

৩ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত

News Desk

স্থলপথে রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা: বেনাপোলে আটকে ৩৬ ট্রাক গার্মেন্টস পণ্য

brs@admin
Translate »