বিআরএস টাইমস ডেস্ক : বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা। প্রতিদিন হাজারো মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। জুমা ও ঈদের নামাজে লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এই এলাকা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় এই মসজিদের সৌন্দর্য যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মসজিদের সামনের ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকানপাট এবং বিশৃঙ্খল পরিবেশে দুর্ভোগে পড়ছেন মুসল্লিরা। কেন এমন পরিস্থিতি? জানাচ্ছি বিস্তারিত।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি। এর নির্মাণকাজের উদ্যোগ নেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সমাজসেবক আবদুল লতিফ বাওয়ানী। স্থপতি এ টি এম আবদুল খালেক-এর নকশায় নির্মিত এই মসজিদটি বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।
পবিত্র কাবা শরিফের আদলে নির্মিত বর্গাকার নকশার কারণে বায়তুল মোকাররম অন্যসব মসজিদ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। ১৯৬৮ সালে মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রায় ৮ দশমিক ৩০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই মসজিদ কমপ্লেক্সে একসঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। জুমা, ঈদ ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ধর্মীয় স্থাপনাকে ঘিরে এখন দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। মসজিদের সামনের ফুটপাত ও আশপাশের এলাকায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান, হকার এবং বিভিন্ন ধরনের অবৈধ দখল। ফলে প্রধান প্রবেশপথগুলো অনেক সময় সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে জুমার দিন কিংবা রমজান মাসে মুসল্লিদের চলাচল চরম ভোগান্তির মুখে পড়ে। ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা কঠিন হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে অনেককেই মূল সড়ক ব্যবহার করতে হয়, যা নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, কিছুদিন পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে ফুটপাত। ফলে প্রশ্ন উঠছে—উচ্ছেদ অভিযান কি কেবল সাময়িক? নাকি স্থায়ী সমাধানের অভাবেই জাতীয় মসজিদের পরিবেশ দিন দিন আরও নষ্ট হচ্ছে?
শুধু চলাচলের সমস্যা নয়, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত দোকানপাট, ব্যানার, ময়লা-আবর্জনা এবং যানজটের কারণে জাতীয় মসজিদের নান্দনিক সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক মুসল্লি ও নগর পরিকল্পনাবিদ। তাদের মতে, দেশের জাতীয় মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও ধর্মীয় পরিচয়েরও প্রতীক। তাই এর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ রাখা রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়তুল মোকাররমের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মসজিদের চারপাশের ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত তদারকি, অবৈধ দোকান পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা, পথচারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের ব্যবস্থা করা, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আলোকসজ্জা আরও উন্নত করা, মসজিদের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক সৌন্দর্য সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়; এটি কোটি মুসলমানের আবেগ, বিশ্বাস ও বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। তাই এই মসজিদের সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা এবং মর্যাদা রক্ষা করা কেবল সরকারের নয়, এটা সকলের দায়িত্ব।
বিআরএসটি/এসএস

