গাজা সম্পর্কে এক স্তূপ লিফলেট হাতে নিয়ে অধ্যাপক বিপিন কুমার ত্রিপাঠী প্রতিটি কাগজ পুরাতন দিল্লিতে অবস্থিত মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ রাজঘাটের দর্শনার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ত্রিপাঠির কাছে এই স্থানটি ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং একই সঙ্গে গাজায় ২১ লাখ মানুষের ওপর ইসরায়েলের আরোপিত গণ-অনাহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) ৭৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ ভারতীয় গান্ধীর অহিংস প্রতিবাদের একটি রূপ হিসেবে এবং নিজ দেশবাসীর মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি একই রকম সহানুভূতি জাগানোর আশায় অনশনে বসেন।
বিপিন আরব নিউজকে বলেন, ‘আমি বিবেককে জাগ্রত করতে চাই, কারণ এটি আমাদের দেশের স্বাধীনতা দিবস। আমরা যদি অন্যদের, বিশেষ করে সবচেয়ে নিপীড়িতদের স্বাধীনতার অনুভূতি জাগ্রত না করি, তাহলে স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বের মানুষের মুখোমুখি প্রধান সমস্যাগুলো এবং গাজায় চলমান চরম সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা এবং সহানুভূতি তৈরি করছি। মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে…তাদের অনাহারে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে।’
নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির পদার্থবিদ্যার প্রাক্তন অধ্যাপক বিপিন কুমার ত্রিপাঠী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পরিবারের একজন সদস্য। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে একজন অ্যাক্টিভিস্ট।
২০১৩ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি সমাজসেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। শান্তির বার্তা নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন।
তার প্রচারণার মধ্যে, প্রায়শই লোকেদের কথোপকথনে যুক্ত করা এবং ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে তথ্যপত্র ও ব্রোশার বিতরণ করা অন্যতম। এর মধ্যে কাশ্মীরের সমস্যা এবং সাধারণ নাগরিকদের তাদের সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার দেওয়ার দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গত এক মাস ধরে তিনি গাজার ওপর মনোনিবেশ করেছেন। তিনি ‘গাজার দুর্ভোগ আমাদের জাগিয়ে তুলতে হবে’ শীর্ষক হিন্দি এবং ইংরেজি লিফলেট বিতরণ করেছেন। এটি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় এবং ফিলিস্তিনি সংগ্রামের মধ্যে মিল তুলে ধরেছে, পাশাপাশি ভারতীয়দেরও কথা বলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ত্রিপাঠী শুক্রবার পুরাতন দিল্লি এবং গান্ধী স্মৃতিসৌধে একই লিফলেট বিতরণ করছিলেন। এই স্থানটিকে তিনি ‘মানবতাবাদের জন্য শহীদের প্রতীক’ হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মানুষই একে অপরের চেয়ে নিকৃষ্ট বা শ্রেষ্ঠ নয়। প্রতিটি মানুষের পূর্ণ মর্যাদা এবং স্বাধীনতার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি আজ এখানে বসে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা স্মরণ করছি, আমাদের শহীদদের স্মরণ করছি, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় জনসাধারণের কথা স্মরণ করছি। সেই সঙ্গে গত ২২ মাস ধরে গণ-অনাহার এবং বোমা হামলার কারণে বেঁচে থাকার চরম সংকটে ভুগছেন – এমন ফিলিস্তিনিদের কথা স্মরণ করে আমি এখানে উপবাস করছি।’
ভারতের নাগরিক সমাজ এবং বিরোধী দলীয়রা ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে কথা বলে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি মূলত নীরব রয়েছে।
ত্রিপাঠী ভারত সরকারকে ‘অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য, গাজা (এবং) ইসরায়েলের প্রতি তার অবস্থান পরিবর্তন করার’ আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার দিনের শেষে পুলিশ তাকে রাজঘাট থেকে সরিয়ে দেয়। পুলিশ তাকে বলে, এই স্থানটি বিক্ষোভের স্থান নয়। এর আগেও নয়াদিল্লিতে ফিলিস্তিনপন্থী অন্যান্য সমাবেশে বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়েছে।
কিন্তু ত্রিপাঠী বলেছেন, তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাবেন। কারণ তিনি চান ভারতের জনগণ ‘তাদের চোখ খুলুক’।
তিনি বলেন, ‘ভারতের স্বাধীনতা কেবল ভারতীয় জনগণের স্বাধীনতা নয়; যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন, তারা অন্যদের স্বাধীনতারও যত্ন নিয়েছিলেন।’
ত্রিপাঠী আরও উল্লেখ করেন, ‘আমি চাই এই দেশের মানুষ তাদের মাথা থেকে কুসংস্কার দূর করুক এবং গাজার দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের যন্ত্রণা অনুভব করুক, কারণ তারা আমাদের থেকে আলাদা নয়। তারা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একই ঔপনিবেশিক সংগ্রামের অংশ, যা আমরা বহন করেছিলাম … তাই আমি চাই আমাদের দেশের মানুষ তাদের যত্ন নেবে।’.
বিআরএসটি / জেডএইচআর

