চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। রোববার (২০ এপ্রিল) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া উভয়পক্ষ ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী পানি ব্যবস্থাপনা মাস্টারপ্ল্যান—বিশেষ করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প—শুরু করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
বৈঠকে উভয়পক্ষ অবকাঠামো, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন খাতে আলোচনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো চীন সফরে যেসব পরিকল্পনা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আমরা চাই না এই গতি হারিয়ে যাক।’
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এটিই আমাদেরও অগ্রাধিকার। চীনে আমরা অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছি। এখন আর দুই-তিন বছর চুক্তি সইয়ের অপেক্ষা নয়—আমরা দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।’
বৈঠকে মোংলা ও আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তা শেষ হলেই ডেভেলপারদের কাছে এলাকা হস্তান্তর করা হবে।
চীন থেকে চারটি নতুন জাহাজ কেনার বিষয়েও আলোচনা হয়। চীনা রাষ্ট্রদূত জানান, এই প্রক্রিয়া চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যেই শেষ হবে।
চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী অচিরেই বাংলাদেশ সফর করবেন বলে জানান রাষ্ট্রদূত। তার সঙ্গে প্রায় ১০০ সদস্যের বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদল থাকবেন, যারা নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করবেন।
বিডা চেয়ারম্যান আশিক বলেন, ‘আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের কেন্দ্র করে একটি ছোট পরিসরের বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করবো।’
স্বাস্থ্য খাতেও সহযোগিতা গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়। চীনের পক্ষ থেকে একটি ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট নির্মাণেও চলমান সহায়তার কথা জানানো হয়।
চীনের কুনমিং থেকে চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য চিকিৎসা ভিসা দ্রুত প্রক্রিয়ার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।
প্রধান উপদেষ্টা সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে চীনা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন, যাতে তরুণ প্রজন্ম চীনা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হতে পারে।
উভয়পক্ষ ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী পানি ব্যবস্থাপনা মাস্টারপ্ল্যান—বিশেষ করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প—শুরু করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
প্রধান উপদেষ্টা চীনে পাট রপ্তানি বাড়ানোর কথা বলেন এবং লোকোমোটিভ খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। চট্টগ্রাম ও সৈয়দপুরে লোকোমোটিভ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
কৃষিপণ্যের বাণিজ্যেও অগ্রগতি হয়েছে। চলতি মৌসুমেই বাংলাদেশ চীনে আম রপ্তানি শুরু করবে এবং আগামী বছর কাঁঠাল রপ্তানি শুরু হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি নিজে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একটি ঝুড়ি ভর্তি টাটকা আম পাঠাবো।’
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খাল্লিউর রহমান, বিডা চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ বিন হারুন, বিশেষ সহকারী ফাইজ তায়েব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া ও এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ।

