দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তরুণ সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি দেশের তরুণরা যদি পরিবর্তনের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চায়, তাহলে সেই পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব। দেশের উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তরুণ সমাজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি দেশের তরুণ সমাজ পরিবর্তন চাইলে দেশকে পরিবর্তন করা সম্ভব। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা বিশ্ব দেখেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, “আসুন এবার রাষ্ট্রকে, দেশকে আমরা পুনর্গঠন করি।” একই সঙ্গে আগামী তিন মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ডেঙ্গু সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে, তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতির অন্তত ৮০ শতাংশ উন্নতি করা সম্ভব। এ জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশব্যাপী এই বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি চলবে আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও একযোগে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।
কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জনসমাগমস্থলের আশপাশে জমে থাকা পানি ও আবর্জনা অপসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ও শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের স্কাউটস, বিএনসিসি, গার্লস গাইড, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে স্কাউটসের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ এবং বিএনসিসির সদস্য প্রায় ২২ হাজার। এর পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে।
প্রাথমিক স্কুল ও এবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানান তিনি। বিপুল এই শিক্ষার্থী ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশ গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের সব জেলা অনলাইনের মাধ্যমে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক না হয়ে সারাদেশে একই সময়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
‘দেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে একত্রিত হয়েছি’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যারা এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, তারা সবাই একটি লক্ষ্য নিয়ে একত্রিত হয়েছেন। সেই লক্ষ্য হলো দেশকে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ তৈরি করা।
তিনি বলেন, “এই দেশটাকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। আমরা সবাই আজকে এখানে একত্রিত হয়েছি। আমরা একটি লক্ষ্য নিয়ে একত্রিত হয়েছি। সেটি হলো দেশ গড়ার লক্ষ্য।”
দেশের উন্নয়ন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি না হলে টেকসই পরিবর্তন আনা কঠিন।
যত্রতত্র আবর্জনা ফেললেই বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাঙারি, পুরোনো কাগজপত্র, প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী, মাটির পাত্রসহ নানা ধরনের পরিত্যক্ত জিনিসে পানি জমে থাকতে পারে। এসব জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন ঘটে।
তিনি বলেন, সাধারণভাবে যেসব জায়গাকে মানুষ গুরুত্ব দেয় না, সেসব স্থানই অনেক সময় এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়। তাই বাড়ির আশপাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, রাস্তার পাশ এবং অন্যান্য জায়গায় পানি জমে থাকার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই যদি নিজের আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখে এবং অন্যদেরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতন করে, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
‘নিজেকে, পরিবারকে ও দেশকে সুস্থ রাখতে হবে’
পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি শুধু সরকারের কর্মসূচি হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি মানুষ যেখানে সেখানে ময়লা ফেললে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু এভাবে প্রতিদিন ময়লা জমতে থাকলে একসময় তা বড় ধরনের আবর্জনায় পরিণত হয়। সেখান থেকে রোগজীবাণু ছড়িয়ে মানুষ ও তার পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তাই আসুন আমরা নিজেকে সুস্থ রাখি। নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখি। নিজের সমাজকে সুস্থ রাখি। নিজের দেশকে আমরা সুস্থ রাখার চেষ্টা করি।”
তিনি বলেন, দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজটি খুব কঠিন নয়। প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে সামান্য দায়িত্ব পালন করলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সপ্তাহে এক ঘণ্টা পরিচ্ছন্নতায় দেওয়ার আহ্বান
দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিদিন অনেক সময় ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। প্রতি সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা নিজের বাসা, স্কুল, কলেজ কিংবা প্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিষ্কার করার কাজে দেওয়া হলেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, “আজকে হয়তো আপনাদের একটু কষ্ট হবে। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা যদি আমরা নিজের বাসা, স্কুল, কলেজ বা প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য কাজ করি তাহলে অবশ্যই দ্রুত এই পরিবর্তন আনতে আমরা সক্ষম হবো।”
তার মতে, পরিচ্ছন্নতা শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য নয়; এটি সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং একটি স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক ও জনসমাগমস্থলে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার প্রবণতা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট দিয়ে চলাচলের সময় প্রায়ই দেখা যায়, অনেকে অসচেতনভাবে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন। এই প্রবণতা বন্ধ করতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা।
যারা ময়লা ফেলছেন, তাদের সচেতন করার পাশাপাশি নিরুৎসাহিত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরিতে প্রত্যেক নাগরিককে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘কাজ, কাজ আর কাজ—পরিচ্ছন্নতাই মূল লক্ষ্য’
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে সফল করতে শুধু আলোচনা বা পরিকল্পনা নয়, বাস্তব কাজের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “তাই কথা একটাই। কাজ, কাজ, আর কাজ। এবং পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্ন আর পরিচ্ছন্নতাই হতে হবে আমাদের আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।”
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি দেশ পুনর্গঠন, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন
দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।
এ সময় আরও বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য এবং সাংবাদিকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
দেশের সব জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনলাইনের মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
দেশ গঠনে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
ডেঙ্গু প্রতিরোধের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী মূলত নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে—পরিচ্ছন্নতা শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার দায়িত্ব নয়; বরং প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
তরুণ সমাজ, শিক্ষার্থী, স্কাউটস, বিএনসিসি, গার্লস গাইড ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের তিন মাসব্যাপী এই কর্মসূচি আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এ সময়ে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোই প্রধান লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বান অনুযায়ী, রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।




