সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়নি। খসড়াটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আশা, দ্রুত খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সম্ভব হবে। আগামী বুধবারের মধ্যে ভেটিং সম্পন্ন করা গেলে চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বিলম্ব হলে গেজেট প্রকাশের সময়ও পিছিয়ে যেতে পারে।
সম্ভাব্য তিন তারিখ নিয়ে আলোচনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের জন্য ১৭, ২১ অথবা ২২ সেপ্টেম্বর—এই তিনটি সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো কোনো তারিখ চূড়ান্ত করা হয়নি।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং প্রক্রিয়া কখন শেষ হচ্ছে, তার ওপরই মূলত গেজেট প্রকাশের সময় নির্ভর করছে। ভেটিং শেষ হওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করে তা মুদ্রণের জন্য বিজি প্রেসে পাঠাতে হবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশ করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পে স্কেলের গেজেট জারির দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে একাধিক সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর গেজেট জারির তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও কেন গেজেট হয়নি?
গত ৩১ আগস্ট সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। এর পর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অপেক্ষা শুরু হয়।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হতে পারে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারিতে এত সময় লাগছে কেন।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় কোনো বেতন কাঠামো অনুমোদন হওয়ার পরই তা সরাসরি গেজেট আকারে প্রকাশ করা যায় না। এর আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক, আর্থিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর সারাংশ আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। খসড়াটি ভেটিংয়ের পর প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজন শেষে চূড়ান্ত করা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর সেটি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সঙ্গে প্রচলিত আইন, বিধি ও সংবিধানের কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।
এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ভাষা, শব্দ ও আইনি পরিভাষায় কোনো ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়। ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়, সে বিষয়টিও ভেটিংয়ের সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পে স্কেল শুধু সাধারণ সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নয়। বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে নতুন কাঠামোর আওতায় কার্যকর হবে, সেটিও প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করতে হবে।
সামরিক-বেসামরিক সব পর্যায়ে প্রভাব
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য যে খসড়া পাঠানো হয়, সেখানে মূলত কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, তার সামগ্রিক প্রস্তাব থাকে। কিন্তু অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া তৈরি করতে হয়।
তিনি বলেন, জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করতে হয়।
ফলে সব পক্ষের বিষয়গুলো সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রজ্ঞাপন তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক আমলারা যা বলছেন
সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে।
তবে দীর্ঘ সময় পর নতুন পে স্কেল অনুমোদন হওয়ায় এবার সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ফলে গেজেট প্রকাশে সামান্য বিলম্বও তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
পে স্কেলের খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে না যাওয়ার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটি আটকে থাকার বিষয় নয়। গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেগুলো মেনেই কাজ করতে কিছুটা সময় লাগছে।
তিনি জানান, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজও চলছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দ্রুতই ভেটিংয়ের জন্য খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
গেজেট প্রকাশের পর কী হবে?
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ শেষ করে খসড়াটি সরকারি মুদ্রণালয় বিজি প্রেসে পাঠানো হবে।
বিজি প্রেসে প্রজ্ঞাপন মুদ্রণের পর তা সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
নতুন পে স্কেলে কোন গ্রেডে কত বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, ইনক্রিমেন্ট কীভাবে হবে, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসবে—এসব বিস্তারিত বিষয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
২০১৫ সালের পে স্কেলের সঙ্গে তুলনা
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
এরপর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর, ১৫ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
দীর্ঘ সময় পর নতুন পে স্কেল অনুমোদন হওয়ায় এবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহও বেশি। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশ করে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পরই গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সবকিছু নির্ধারিত সময়ে শেষ করা গেলে ১৭, ২১ অথবা ২২ সেপ্টেম্বরের যেকোনো একদিন নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।




