ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে বিতর্কিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) দ্রুত বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার এই ঘোষণার পর দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোববার এক বক্তব্যে অমিত শাহ বলেন, বিজেপি ও বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের সরকার থাকা রাজ্যগুলোতে ধাপে ধাপে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়ন করা হবে। তার আশা, ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের শাসনে থাকা ২১টি রাজ্যেই ইউসিসি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
ভারতে ফৌজদারি আইন মূলত সবার জন্য অভিন্ন হলেও বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণসহ বিভিন্ন পারিবারিক ও দেওয়ানি বিষয়ে ধর্মীয় সম্প্রদায়ভেদে আলাদা ব্যক্তিগত আইন প্রচলিত রয়েছে। এসব পৃথক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন চালু করাই ইউসিসির মূল লক্ষ্য।
কয়েকটি রাজ্যে ইতোমধ্যে কার্যকর
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ইতোমধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরাখণ্ডে ইউসিসি কার্যকর হওয়ার পর বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যেও এটি চালুর বিষয়ে আলোচনা ও প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে।
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপি সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ইউসিসি।
সরকারের যুক্তি, দেশের সব নাগরিকের জন্য পারিবারিক ও দেওয়ানি বিষয়ে একই আইন থাকলে আইনের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমবে এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা সহজ হবে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, ইউসিসি কার্যকর হলে মুসলিমদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যক্তিগত আইন ও পারিবারিক রীতিনীতি পরিবর্তিত বা সীমিত হতে পারে।
বিশেষ করে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান অনুসরণের সুযোগ কতটা থাকবে—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের মতে, ভারতের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে অভিন্ন দেওয়ানি আইন বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট সব সম্প্রদায়ের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের আরও আশঙ্কা, অভিন্ন আইনের নামে কোনো একটি সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি বা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে ইউসিসি বাস্তবায়নের বিষয়টি ভারতের রাজনীতি ও সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইউসিসির পক্ষে সরকারের যুক্তি
অন্যদিকে ইউসিসির সমর্থকরা বলছেন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। বরং এর মাধ্যমে দেশের সব নাগরিকের জন্য একই ধরনের অধিকার ও আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা হবে।
সমর্থকদের দাবি, ইউসিসি কার্যকর হলে বহুবিবাহের মতো প্রথা বন্ধ করা, নারী-পুরুষের সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তাদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন থাকায় একই ধরনের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন আইনি ব্যবস্থা কার্যকর হয়। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এই পার্থক্য কমিয়ে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করবে।
২০২৯ সালের মধ্যে ২১ রাজ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য
অমিত শাহের ঘোষণায় ইউসিসি বাস্তবায়নের বিষয়টি আবারও ভারতের জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের শাসনে থাকা রাজ্যগুলোতে ধাপে ধাপে এই আইন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তার প্রত্যাশা, ২০২৯ সালের মধ্যে এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
তবে একটি দেশে একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের বসবাসের বাস্তবতায় ইউসিসি বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে বিতর্ক রয়েছে।
ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত মূলত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও অনুমান অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ২২ কোটি মুসলিম রয়েছেন। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী।
ফলে দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের উদ্যোগ শুধু আইনি বা রাজনৈতিক বিষয় নয়, এর সঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত আইন ও সামাজিক রীতিনীতির প্রশ্নও জড়িত। অমিত শাহের নতুন ঘোষণার পর ইউসিসি নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।




