BRS TIMES
মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ইরানে পেট্রোলের দাম বাড়ল
অন্যান্য সংবাদআন্তর্জাতিকপ্রচ্ছদশিরোনাম

মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ইরানে পেট্রোলের দাম বাড়ল

বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ ইরানের অবস্থান সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জালে বন্দি। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ তীব্র হওয়ার পটভূমিতে ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। অতিরিক্ত পেট্রোল ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণ করার যে সিদ্ধান্ত তেহরান নিয়েছে, তা মূলত ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা সামাল দেওয়ার এক মরিয়া প্রয়াস হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

পেট্রোলের নতুন মূল্য কাঠামো ও কোটা পদ্ধতি

ইরান বিশ্বে জ্বালানি তেলে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দেওয়া দেশগুলোর একটি। বহু বছর ধরে সেখানে পানির চেয়েও কম দামে পেট্রোল বিক্রি হয়ে আসছে। তবে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ইরানে সাধারণত তিন ধাপে পেট্রোলের দাম ও কোটা নির্ধারিত হয়:

  • প্রথম ধাপ (ভর্তুকিপ্রাপ্ত কোটা): একজন ব্যক্তি প্রতি মাসে প্রথম ৬০ লিটার পেট্রোল প্রতি লিটার ১,৫০০ তোমানে (১ তোমান = ১০ ইরানি রিয়াল) ক্রয় করতে পারেন।
  • দ্বিতীয় ধাপ (আংশিক ভর্তুকি): পরবর্তী ৫০ লিটারের জন্য প্রতি লিটারে মূল্য পরিশোধ করতে হয় ৩,০০০ তোমান।
  • তৃতীয় ধাপ (অতিরিক্ত ব্যবহার): নির্ধারিত ১১০ লিটার সীমা পার হওয়ার পর অতিরিক্ত পেট্রোল ব্যবহারের জন্য এতদিন প্রতি লিটারে ৫,০০০ তোমান দিতে হতো।

সরকারের নতুন ঘোষণায় জানানো হয়েছে, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে এই তৃতীয় ধাপের পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ১০,০০০ তোমান করা হবে—যা আগের দামের তুলনায় ঠিক দ্বিগুণ।

ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক ভিডিও বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, বিশেষজ্ঞদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর একাধিক প্রস্তাব উঠে এসেছিল। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করতেই প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পেট্রোলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেবল অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে নতুন এই বর্ধিত দর প্রযোজ্য হবে।

ইরানি মুদ্রার চরম দরপতন ও মূল্যস্ফীতি

পেট্রোলের দাম দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর মূল্যে ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় মুদ্রা বিনিময় বাজারের তথ্যানুযায়ী, ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর বর্তমানে ২২ লাখ অতিক্রম করেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর আগে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল প্রায় ১৭ লাখ রিয়াল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া এবং বাণিজ্যিক পথগুলো সংকুচিত হয়ে আসার কারণে এপ্রিলের শেষ দিকে এটি ১৮ লাখে পৌঁছায়, যা ছিল তখন পর্যন্ত রিয়ালের সর্বকালের সর্বনিম্ন মান। এরপর প্রতিনিয়ত দরপতনের ফলে বর্তমানে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা চরম মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মুদ্রাস্ফীতির এই বিশাল চাপের মধ্যে পেট্রোলের দাম বাড়ানো নাগরিকদের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ’ নীতি ও আন্তর্জাতিক অবরোধ

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কঠোরতা নতুন নয়। তবে সম্প্রতি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ’ (Economic Strangulation) নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগের কথা ঘোষণা করেছেন। Washington-এর মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত শেষ করতে ইরানকে আর্থিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলা।

এই নীতি অনুযায়ী:

  • ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, সেগুলোকে আরও জোরদার করা হয়েছে।
  • ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী এক ধরনের কৌশলগত নৌ-অবরোধ সৃষ্টি করেছে।
  • আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা (SWIFT) থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কারণে দেশটির অপরিশোধিত তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তেল রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে ইরানকে দেউলিয়া করার মার্কিন কৌশলের বিপরীতে তেহরান চেষ্টা করছে নিজেদের বাজেট ঘাটতি কমাতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি করতে। তেলের ভর্তুকি কিছুটা কমিয়ে আনা সেই অর্থনৈতিক কৌশেরই একটি অংশ।

ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও ঐতিহাসিক আশঙ্কা

ইরানের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে পেট্রোলের দাম গভীরভাবে সম্পর্কিত। সরকার তেলের ওপর যে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দেয়, তা ইরানিদের জন্য একটি বড় সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই পেট্রোলের দাম সামান্য বাড়ালেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৯ সালের নভেম্বরে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই মধ্যরাতে যখন সরকার পেট্রোলের দাম প্রায় ২০০% বাড়িয়েছিল, তখন পুরো দেশজুড়ে বিশাল গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। যা পরবর্তীতে রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় রূপ নেয়। সেই অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও তার মন্ত্রীসভা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথম ১১০ লিটার পর্যন্ত তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেবল অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো রাজপথে নতুন কোনো গণ-অসন্তোষ তৈরি না হওয়া দেওয়া।

সামগ্রিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ বার্তা

ইরানের জ্বালানি খাতের এই সংকট কেবল একটি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের একটি বড় সংকেত। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও যদি অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহারকারীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়, তবে তা নির্দেশ করে যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের রাষ্ট্রীয় তহবিল কতটা সংকুচিত হয়ে এসেছে।

একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ-অবরোধ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে ইরান এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি। জ্বালানির এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি সরকারি রাজস্বে কতটুকু স্বস্তি আনবে তা নিশ্চিত নয়, তবে এটি যে দেশটির সাধারণ নাগরিকদের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

Related posts

বিপিএলের দায়িত্ব পেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান

News Desk

শেখ হাসিনা, জয় ও পুতুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

News Desk

চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা

News Desk

কক্সবাজারে রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা

News Desk

শুল্কের পর এবার ভিসা-গ্রিন কার্ডে কড়াকড়ি, নতুন চাপে ভারত

News Desk

ইরানের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন ৭১ জন, কড়া নিরাপত্তায় ইসলামাবাদ

News Desk
Translate »