ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এক ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। যার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, এখন থেকে যুক্তরাজ্যের গাড়ি ও হুইস্কি ভারতে কম শুল্কে রপ্তানি করা যাবে, একইভাবে ভারতের পোশাক, গয়না ও রত্নপাথর যুক্তরাজ্যে আরো সাশ্রয়ে পৌঁছাতে পারবে। এই চুক্তি তিন বছর ধরে চলা কঠিন আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ফল।
২০২২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সময়ে আলোচনার সূচনা হয়। এ বছরের মে মাসে চুক্তির মূল কাঠামোতে সম্মতি আসে এবং সম্প্রতি ভারতের মন্ত্রিসভা তা অনুমোদন দেয়, যদিও ভারতের সংসদে এটি এখনো অনুমোদিত হয়নি। চূড়ান্ত বাস্তবায়নে আরো প্রায় এক বছর সময় লাগবে বলে ধারণা।
চুক্তির আওতায় যেসব পণ্যে শুল্ক হ্রাস পাবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—পোশাক ও জুতা, খাদ্যদ্রব্য (যেমন হিমায়িত চিংড়ি), গয়না ও রত্ন, গাড়ি, উচ্চমূল্যের গাড়ি, হুইস্কি, জিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কসমেটিকস, চকোলেট ও বিস্কুট।
বিশেষ করে হুইস্কির ওপর শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে অর্ধেকে (৭৫ শতাংশ) নামিয়ে আনা হয়েছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৪০শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে বছরে ৪.৮ বিলিয়ন পাউন্ড যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে এবং ২ হাজার ২০০-এর বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মূলত প্রযুক্তি, অ্যারোস্পেস, অগ্রসর উৎপাদন শিল্প এবং সাপ্লাই চেইন খাতের কর্মীরা এর সুবিধা পাবেন।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অবৈধ অভিবাসন রোধ ও নিরাপত্তা জোরদারে নতুন পরিকল্পনা।
দুই দেশ এখন থেকে অপরাধমূলক রেকর্ড শেয়ার করবে, যা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া, নজরদারির তালিকা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সাহায্য করবে।
চুক্তিতে উভয় দেশ তাদের কোনো কর্মী যদি অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে কাজ করেন, তাহলে তাকে কেবল নিজ দেশের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ভারত এই ব্যবস্থাকে ‘অভূতপূর্ব অর্জন’ বলে উল্লেখ করেছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই চুক্তি ভারতীয় শ্রমিকের কারণে ব্রিটিশ শ্রমিকদের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু ব্রিটেনের বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস এই দাবি ‘সম্পূর্ণ ভুল’ দাবি করে বলেন, ভারতীয় কর্মী নিয়োগে আলাদা করে কোনো কর সুবিধা নেই।
বরং ভিসা ও এনএইচএস সারচার্জের কারণে খরচ আরো বেশি হয়।
চুক্তির আওতায় শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া হয়েছে। এক বছর আগে যুক্তরাজ্য ও ভারতের মধ্যে ‘টেকনোলজি সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা যৌথভাবে টেলিকম নিরাপত্তা ও উদীয়মান প্রযুক্তিতে কাজ করার পথ উন্মুক্ত করেছে। যদিও এটি একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তবে ব্রিটেন এখনও ভারতের আর্থিক ও আইনগত খাতে যেটুকু প্রবেশাধিকার চেয়েছিল, তা পুরোপুরি পায়নি। পাশাপাশি, ব্রিটেনের ‘উচ্চ-কার্বন শিল্পে কর’ আরোপের পরিকল্পনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে। যেটি ভারতের রপ্তানিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এটি প্রধানমন্ত্রী মোদির যুক্তরাজ্যে চতুর্থ সফর। এই সফর দুই দেশের মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। প্রধানমন্ত্রী স্টারমার স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এই চুক্তি এখন বাস্তবায়নের পথে। দুই দেশের জন্যই একটি ঐতিহাসিক দিন।’
সূত্র : বিবিসি
বিআরএসটি / জেডএইচআর

